মানবসভ্যতার আবির্ভাব থেকে বিবাহ ব্যবস্থা নানা রূপে দেখা যায়। সমাজ, ধর্ম, সংস্কৃতি—সবকিছুর প্রভাবেই বিবাহ রীতির বৈচিত্র্য এসেছে। এর মাঝেই ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ, মানবিক এবং বাস্তবতাভিত্তিক সমাধান প্রদান করেছে—সীমিতভাবে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি। তবে এটি ফরজ, সুন্নত বা উৎসাহমূলক নয়; বরং প্রয়োজনে অনুমোদিত (মুবাহ) একটি বিধান।
এই নিবন্ধে ইসলামের দৃষ্টিতে বহুবিবাহের কারণ, সামাজিক বাস্তবতা এবং ধর্মীয় নির্দেশনার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো।
১. বহুবিবাহ বা Polygamy-এর সংজ্ঞা
একজন পুরুষ যখন একাধিক মহিলাকে বিবাহ করে, তাকে Polygyny বলা হয়, আর নারী একাধিক পুরুষকে বিবাহ করলে তাকে Polyandry বলা হয়। সম্মিলিতভাবে এ দুটি মিলিয়ে Polygamy নামে পরিচিত।
ইসলাম শুধুমাত্র পুরুষকে সীমিতভাবে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের অনুমতি দেয় এবং নারীকে একাধিক স্বামী গ্রহণের অনুমতি দেয় না—সমাজ, জৈবিক, বংশানুক্রমিক ও পারিবারিক ক্ষেত্রে এর সুস্পষ্ট যৌক্তিক কারণ রয়েছে।
২. কোরআন—একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যা ‘একটিই বিবাহ করো’ বলে
বিশ্বের অন্যান্য ধর্মীয় গ্রন্থ—বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, গীতা, বাইবেল—কোথাও “একজন পুরুষ কেবল একটি বিবাহ করবে”—এমন কোনো নির্দেশ নেই।
বরং:
- শ্রীকৃষ্ণের বহু স্ত্রী ছিল।
- রামচন্দ্রের পিতা দশরথেরও একাধিক স্ত্রী ছিল।
- ইহুদিদের মধ্যেও বহুবিবাহ প্রচলিত ছিল।
- খ্রিস্টান ধর্মে আব্রাহাম, জ্যাকব, সলোমন ও ডেভিড এর বহু স্ত্রী ছিল।
পরে বিভিন্ন সমাজনেতা আইন করে তা সীমাবদ্ধ করেছে। কিন্তু ধর্মগ্রন্থে নিষেধ ছিল না।
কেবল কোরআনই প্রথম ধর্মগ্রন্থ যেখানে স্পষ্ট সীমা ও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
৩. বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের তুলনায় অন্য ধর্মের মধ্যেই বহুবিবাহ বেশি ছিল
১৯৫১–১৯৬১ সালের ভারতীয় পরিসংখ্যানে দেখা যায়—
- হিন্দুদের বহুবিবাহের হার = ৬.৫%
- মুসলিমদের বহুবিবাহের হার = ৩.১%
যদিও আইন মুসলমানদের অনুমতি দেয়, হিন্দুদের দেয় না, তারপরেও হিন্দু সমাজে বহুবিবাহের হার বেশি ছিল।
কারণ—ধর্মীয় গ্রন্থে নিষেধ ছিল না, আইন পরে এসেছে।
৪. কোরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশ: সীমিত অনুমতি, বাধ্যতামূলক নয়
সূরা নিসা ৪:৩ এ বলা হয়েছে—
“নারীদের মধ্য থেকে তোমরা পছন্দমতো দুই, তিন বা চারটি বিবাহ করতে পারো; কিন্তু যদি ন্যায়বিচার করতে না পারার আশঙ্কা কর, তবে একটিই যথেষ্ট।”
এ আয়াত তিনটি বাস্তবতা তুলে ধরে:
- একাধিক বিবাহ অনুমোদনযোগ্য।
- সীমা = চার।
- ন্যায়-সমতা বজায় না রাখতে পারলে আল্লাহর নির্দেশ: ‘একটিই বিবাহ করো’।
অন্যদিকে সূরা নিসা ৪:১২৯ এ আরও স্পষ্ট করা হয়েছে—
“তোমরা যতই চেষ্টা করো, স্ত্রীদের মাঝে পুরোপুরি সমতা বজায় রাখতে কখনোই সক্ষম হবে না।”
অর্থাৎ—বহুবিবাহ কোনো আদর্শ নয়, বরং একটি অনুমোদন, কঠিন শর্ত-সাপেক্ষে।
৫. ইসলামে বিধানের স্তর (হুকুম)
ইসলামে কাজ পাঁচভাগে ভাগ:
- ফরজ—অবশ্যই করতে হবে
- মুস্তাহাব—করলে ভাল
- মুবাহ—করলেও সমস্যা নেই, না করলেও নেই
- মাকরূহ—না করাই উত্তম
- হারাম—নিষিদ্ধ
বহুবিবাহ মুবাহ—অর্থাৎ প্রয়োজন হলে জায়েয, কিন্তু কোনোভাবেই উত্তমতা বা শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়।
৬. বাস্তবতা—নারী সাধারণত পুরুষের তুলনায় বেশি টিকে থাকে
প্রাকৃতিকভাবে:
- শিশু অবস্থায় বালক মৃত্যুর হার বালিকার তুলনায় বেশি
- দুর্ঘটনা, যুদ্ধ, রোগব্যাধিতে পুরুষ বেশি মারা যায়
- জীবনের গড় আয়ুতে নারী এগিয়ে থাকে
- পৃথিবীতে বিধবার সংখ্যা বিপুল, কিন্তু বিধুর সংখ্যা কম
এতে প্রমাণ হয়—নারীর সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা বেশি হয়ে থাকে।
৭. কিছু দেশে নারী কম হওয়ার কারণ—কন্যা ভ্রূণ হত্যা
ভারতসহ কিছু দেশে প্রতি বছর বহু কন্যা সন্তানের গর্ভপাত ঘটে। পরিসংখ্যান বলছে—
- বছরে প্রায় ১০ লক্ষের বেশি কন্যা ভ্রূণের গর্ভপাত ঘটে।
- যদি এসব হত্যা বন্ধ হতো, তাহলে এসব দেশে নারীর সংখ্যা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি হতো।
৮. বৈশ্বিক পরিসংখ্যান—নারী পুরুষের তুলনায় অধিক
উদাহরণ:
- যুক্তরাষ্ট্রে ৭৮ লক্ষ নারী বেশি
- শুধু নিউইয়র্কেই ১০ লক্ষ নারী বেশি
- গ্রেট ব্রিটেনে ৪০ লক্ষ নারী বেশি
- জার্মানিতে ৫০ লক্ষ নারী বেশি
- রাশিয়ায় ৯০ লক্ষ নারী বেশি
- যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২.৫ কোটি পুরুষ সমকামী—অর্থাৎ তারা নারীদের বিয়ে করে না
ফলে কোটি কোটি নারী স্বামী পায় না।
৯. কোনো সমাজেই সব পুরুষকে এক স্ত্রীতে সীমাবদ্ধ করা সম্ভব নয়
যখন—
- নারীর সংখ্যা বেশি
- বহু পুরুষ সমকামী
- বহু পুরুষ যুদ্ধ, দুর্ঘটনায় মারা যায়
তখন লক্ষ লক্ষ নারী স্বামীহীন থেকে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে নারীদের সামনে দুটি পথ থাকে:
- কারো দ্বিতীয় স্ত্রী হওয়া, সামাজিক সম্মান নিয়ে
- উপপত্নী বা সম্পর্কহীন ভোগ্যপণ্য হয়ে থাকা, কোনো বৈধতা বা নিরাপত্তা ছাড়াই
একজন সম্মানিত নারী কোন পথ বেছে নেবে—এর উত্তর সহজ।
ইসলাম নারীর মান-মর্যাদা রক্ষার জন্য প্রথম পথটিকেই বৈধ করেছে।
সংক্ষিপ্ত উপসংহার
ইসলাম বহুবিবাহকে:
- সামাজিক বাস্তবতা
- যুদ্ধ, বৈষম্য, নারীর অনুপাত
- বিধবা নারীর সুরক্ষা
- নারীর মান-মর্যাদার সংরক্ষণ
- অবৈধ সম্পর্ক প্রতিরোধ
- পরিবার ও সমাজের স্থিতিশীলতা
—এসব প্রেক্ষাপটে মানবিক ও সীমিত অনুমতি হিসেবে রেখেছে।
মূল কথা
- বহুবিবাহ ইসলামে বাধ্যতামূলক নয়।
- সমতা বজায় রাখা কঠিন—তাই এক স্ত্রীই আদর্শ।
- প্রয়োজনে সীমিত অনুমতি—নারীর সুরক্ষার জন্য।





