ইসলামে নারীর একাধিক স্বামী গ্রহণ নিষিদ্ধ কেন?

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যার ভিত্তি ন্যায়পরায়ণতা, সমতা এবং সামাজিক স্থিতি রক্ষা। আল্লাহ্ নারী ও পুরুষ উভয়কে মর্যাদা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, এবং প্রত্যেকের ওপর আরোপিত দায়িত্বও ভিন্ন। তাই কোনো বিধান দেখে তা অসমতা মনে হলেও বাস্তবে তা মানুষের স্বভাব, প্রবৃত্তি, পরিবারব্যবস্থা এবং সমাজের নিরাপত্তার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

তারই আলোকে অনেকেই প্রশ্ন করেন—
যদি পুরুষ একই সময়ে একাধিক স্ত্রী রাখতে পারে, তাহলে নারী কেন একই সময়ে একাধিক স্বামী রাখতে পারে না?

ইসলাম এই বিষয়ে বেশ কিছু বাস্তব, যুক্তিসংগত ও প্রজ্ঞাভিত্তিক কারণ তুলে ধরে। নিচে সেগুলো সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।

১. বংশ ও পিতৃত্ব নির্ধারণের সমস্যা (Lineage Clarity)

একজন পুরুষ যদি একাধিক স্ত্রী রাখে, প্রতিটি সন্তানের মা ও বাবা কে—তা স্পষ্টভাবে জানা যায়।
কিন্তু যদি একজন নারীর একই সময়ে একাধিক স্বামী থাকত, তবে—

  • তার গর্ভজাত সন্তানের জৈবিক পিতা কে, তা অনিশ্চিত হয়ে যেত।
  • পরিবার, উত্তরাধিকার, বংশপরিচয়—সবই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করত।

ইসলাম বংশপরিচয় (নسب) সংরক্ষণকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেয়। পিতৃত্ব অজানা শিশুরা সামাজিকভাবে, মানসিকভাবে এবং আইনি দিক থেকেও সংকটে পড়ে।

যদিও আধুনিক যুগে DNA পরীক্ষা পিতৃত্ব নির্ধারণে সক্ষম, তবে— ইসলামিক আইন শুধু জৈবিক সত্য বা পরীক্ষার ওপর ব্যাখ্যা করে না—এটি সামাজিক আদর্শ, ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতাকে কেন্দ্র করে বিধান নির্ধারণ করে।

২. নারী ও পুরুষের স্বভাবগত ভিন্নতা

ইসলাম বলে—

  • পুরুষের মধ্যে একাধিক স্ত্রী গ্রহণের প্রবৃত্তি (polygamy instinct) স্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে।
  • নারী সাধারণত সম্পর্কের একাগ্রতা, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।

বহু মনোবৈজ্ঞানিক গবেষণাও দেখায় যে নারীর জৈবিক, মানসিক এবং মাতৃত্বকেন্দ্রিক কাঠামো বহু স্বামী ব্যবস্থা (polyandry)–র সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

৩. দায়িত্ব ও পরিবার পরিচালনার অসম্ভবতা

একজন পুরুষ একই সময়ে কয়েকজন স্ত্রী ও তাদের পরিবারের ব্যয়ভার বহন করতে পারে। ইসলাম এ ক্ষেত্রে শর্ত দিয়েছে—

  • ন্যায়বিচার করতে হবে,
  • ভরণপোষণ ও নিরাপত্তা দিতে হবে,
  • সময়, সম্পদ ও অধিকার সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু যদি একজন নারীর একাধিক স্বামী থাকত—

  • কার সংসার কে চালাবে?
  • সন্তান কার নামে লিখিত হবে?
  • দাম্পত্য অধিকার কার কাছে দাবি করবে?
  • স্বামীদের পারস্পরিক সংঘাত কীভাবে সমাধান হবে?

এটি একটি কার্যত অব্যবহারযোগ্য ও অস্থিতিশীল পরিবারব্যবস্থা, যা সমাজকে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।

৪. স্বাস্থ্যঝুঁকি ও যৌনরোগ সংক্রমণের সম্ভাবনা

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে—

  • একজন নারীর একই সময়ে একাধিক স্বামীর সঙ্গে যৌনসম্পর্ক হলে STI/STD সংক্রমণের হার বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
  • নারীর শরীরের গঠনগত কারণে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি।

অন্যদিকে, একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে—

  • স্ত্রীদের মধ্যে যৌন সম্পর্ক হয় না,
  • পুরুষ যদি ব্যভিচার না করে, তবে সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনা অনেক কম।

ইসলাম সবক্ষেত্রেই শরীর, পরিবার ও সমাজের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেয়।

সর্বোপরি — আল্লাহর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত

সবশেষে মনে রাখতে হবে, ইসলাম কোনো বিধান শুধুমাত্র জৈবিক, প্রযুক্তিগত বা সামাজিক যুক্তির ওপর প্রতিষ্ঠা করে না—বরং আল্লাহ্‌র জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সর্বব্যাপী বিচার হল প্রত্যেক বিধানের মূল ভিত্তি। আমরা কিছু কারণ বোঝতে পারি, কিছু কারণ আংশিকভাবে বুঝি, আর কিছু কারণ আমাদের জ্ঞানের সীমার বাইরে। সর্বোপরি আল্লাহ নারীদেরকে একই সময়ে একাধিক স্বামী গ্রহণের অনুমতি দেননি, আর একজন মুসলিমের জন্য আল্লাহর এই সিদ্ধান্তই সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত। কারণ তিনিই সবচেয়ে ভালো জানেন কোন বিধান মানুষের জন্য কল্যাণকর, কোনটি পরিবার ও সমাজকে সুরক্ষিত রাখে, আর কোনটি নৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2025 Logic TV — All Rights Reserved.