ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ/হারাম কেন?

মদ্যপান মানব সমাজে প্রাচীনকাল থেকেই একটি ভয়াবহ অভিশাপ হিসেবে বিদ্যমান। যুগে যুগে এটি অসংখ্য মানুষের জীবন ধ্বংস করেছে, পরিবার ভেঙে দিয়েছে এবং সমাজে অপরাধ, অশ্লীলতা ও নৈতিক অবক্ষয়ের জন্ম দিয়েছে। আজও বিশ্বজুড়ে মদ্যপানের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এই সর্বগ্রাসী ক্ষতির কারণেই ইসলাম মদ্যপানকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

মদ

১. কুরআন মজীদে মদ্যপান স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ

ইসলামি শরিয়তে মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা কুরআনের সুস্পষ্ট নির্দেশের মাধ্যমে এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

“হে ঈমানদারগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারণকারী তীর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং তোমরা এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা কি নিবৃত্ত হবে না?”
(সূরা মায়িদাহ: ৯০–৯১)

👉 এই আয়াত থেকেই স্পষ্ট যে মদ্যপান শুধু হারাম নয়, বরং এটি শয়তানি কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত।

২. অন্যান্য ধর্মগ্রন্থেও মদ্যপানের নিন্দা

শুধু ইসলাম নয়, অন্যান্য ঐশী ধর্মগ্রন্থেও মদ্যপানের ক্ষতিকর দিক তুলে ধরা হয়েছে।

বাইবেলে বলা হয়েছে—

  • “মদ উপহাসকারী এবং প্রবল পানীয় কলহ সৃষ্টিকারী; যে এতে আসক্ত হয় সে জ্ঞানী নয়।”
    (Proverbs 20:1)
  • “আর মদে মত্ত হয়ো না।”
    (Ephesians 5:18)

👉 অর্থাৎ, মানবজাতির কল্যাণের জন্য সব ধর্মেই নেশাজাত দ্রব্যকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

মদ্যপানের চিত্র

৩. মদ মানুষের মস্তিষ্ক ও বিবেক ধ্বংস করে

মানুষের মস্তিষ্কে এমন একটি নিয়ন্ত্রণকারী অংশ রয়েছে, যা তাকে ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে শেখায়।
মদ সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে অচল করে দেয়।

ফলস্বরূপ—

  • বিবেক লোপ পায়
  • শালীনতাবোধ নষ্ট হয়
  • অশ্লীল ভাষা ও আচরণ প্রকাশ পায়
  • চলাফেরা ও কথা বলার ক্ষমতা নষ্ট হয়
  • অনেক সময় মানুষ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে

👉 এ কারণেই ইসলাম মদকে ‘আক্ল নষ্টকারী’ হিসেবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে।

৪. মদ্যপান অশ্লীলতা ও ভয়াবহ অপরাধের পথ খুলে দেয়

মদ্যপানের ফলে সংঘটিত অপরাধগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • ব্যভিচার
  • ধর্ষণ
  • নিকটাত্মীয়দের সাথে অসৎ আচরণ
  • যৌনবাহিত রোগ (যেমন—এইডস)

গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ যৌন অপরাধ ও সহিংসতার পেছনে নেশাজাত দ্রব্যের ভূমিকা রয়েছে।
👉 মদ মানুষকে অপরাধে সাহসী করে তোলে, কিন্তু দায়মুক্ত করে না।

৫. ‘সংযত মদ্যপান’ একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা

প্রায় সব মদ্যপায়ীই শুরু করে “পরিমিত পান” দিয়ে। কিন্তু—

  • অভ্যাস ধীরে ধীরে বাড়ে
  • নেশার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়
  • কেউই ইচ্ছাকৃতভাবে মদ্যপায়ী হতে চায় না, কিন্তু অধিকাংশই শেষ পর্যন্ত হয়

👉 অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে—মদের ক্ষেত্রে নিরাপদ সীমা বলে কিছু নেই।

৬. একবারের ভুল আজীবনের লজ্জা হয়ে দাঁড়ায়

নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সংঘটিত একটি মাত্র লজ্জাজনক কাজ—

  • ব্যক্তির সম্মান ধ্বংস করতে পারে
  • পরিবার ও সমাজে চিরস্থায়ী কলঙ্ক বয়ে আনে
  • অনুতাপ করলেও সেই ক্ষতি পূরণ হয় না

👉 ইসলাম মানুষকে এমন পরিস্থিতি থেকেই আগেভাগে রক্ষা করতে চায়।

৭. হাদীস শরীফে মদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা

(ক) মদ সব অপরাধের মূল

রাসুলুল্লাহ ﷺ মদকে সব অপকর্মের চাবিকাঠি বলেছেন।

(খ) অল্প হলেও হারাম

“যে বস্তু অধিক পরিমাণে নেশা সৃষ্টি করে, তার অল্প পরিমাণও হারাম।”

(গ) মদের সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই অভিশপ্ত

হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“আল্লাহ অভিশাপ দিয়েছেন—যে মদ তৈরি করে, যার জন্য তৈরি করে, যে পান করে, যে বহন করে, যার জন্য বহন করা হয়, যে বিক্রি করে, যে মূল্য ভোগ করে এবং যে পান করায়।”

👉 ইসলামে মদের সাথে সামান্য সম্পৃক্ততাও মারাত্মক গুনাহ।

৮. মদ্যপান ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী রোগের কারণ

মদ্যপানের ফলে যে রোগগুলো হতে পারে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • লিভার সিরোসিস (কলিজা নষ্ট হওয়া)
  • মুখ, গলা ও খাদ্যনালির ক্যানসার
  • হৃদরোগ ও অগ্ন্যাশয়ের রোগ
  • প্যারালাইসিস ও মৃগী
  • স্নায়বিক রোগ
  • নিউমোনিয়া ও ফুসফুসের সংক্রমণ
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া
  • গর্ভস্থ সন্তানের মারাত্মক ক্ষতি

👉 বিশেষত নারীদের ক্ষেত্রে মদের ক্ষতি আরও বেশি ভয়াবহ।

মদ্যপানের ভয়াবহ পরিণাম

উপসংহার

ইসলামে মদ্যপান নিষিদ্ধ করা হয়েছে—

  • মানুষের বিবেক রক্ষা করতে।
  • পরিবার ও সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে।
  • অপরাধ ও অশ্লীলতা প্রতিরোধ করতে।
  • শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2025 Logic TV — All Rights Reserved.