কুরআন কি বলে সূর্য পানিতে ডুবে যায়?

ইসলাম ও কুরআন বিষয়ক বিতর্কে একটি অভিযোগ বারবার উঠে আসে — সূরা কাহাফের ৮৬ নম্বর আয়াতটি নাকি বৈজ্ঞানিকভাবে ভুল, কারণ এতে বলা হয়েছে যে সূর্য সাগরের পানিতে ডুবে যায়। যাঁরা কুরআনকে বিজ্ঞানসম্মত বলে দাবি করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে এই অভিযোগটি একটি শক্তিশালী আপত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এই ব্লগে আমরা প্রথমে অভিযোগটি সম্পূর্ণভাবে উপস্থাপন করব, তারপর সেটির যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক জবাব বিশ্লেষণ করব।

প্রথম অংশ: নাস্তিক ও সংশয়বাদীদের অভিযোগ

১. বিজ্ঞান কী বলে — সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত প্রসঙ্গে

বৈজ্ঞানিকভাবে আমরা জানি যে পৃথিবী সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে। পৃথিবী যখন নিজ অক্ষের উপর ঘুরতে থাকে, তখন গোলার্ধের যে অংশটি সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, সে অংশে সূর্যোদয় হয় এবং দিন বিরাজ করে। একইভাবে, গোলার্ধের যে অংশ সূর্যের বিপরীত দিকে মুখ করে, সেখানে সূর্যাস্ত হয় এবং রাত নামে। আদতে, “সূর্যোদয়” বা “সূর্যাস্ত” বলে কোনো ঘটনা সত্যিকার অর্থে ঘটে না। সূর্য অস্তও যায় না, উদিতও হয় না। পৃথিবীর নিজ অক্ষে ঘূর্ণনের কারণে আমাদের এমনটি মনে হয়।

২. কুরআনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ

এই বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার আলোকে সংশয়বাদীরা প্রশ্ন তোলেন — যদি কুরআনকে “বিজ্ঞানময় কিতাব” বলে দাবি করা হয়, তাহলে সেই কুরআনে কেন বলা আছে যে সূর্য পানিতে ডুবে যায়?

তাঁরা দলিল হিসেবে উপস্থাপন করেন কুরআনের সূরা কাহাফ, আয়াত ৮৬

চলতে চলতে যখন সে সূর্যের অস্তগমন স্থানে পৌঁছল তখন সে সূর্যকে এক পংকিল পানিতে অস্ত যেতে দেখল এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল; আমি বললামঃ হে যুলকারনাইন! তুমি তাদেরকে শাস্তি দিতে পার অথবা তাদেরকে সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পার।

এই আয়াতটি উদ্ধৃত করে তাঁরা বলেন — “তোমাদের বিজ্ঞানময় ধর্মীয় কিতাব বলছে যে সূর্য নাকি সাগরের কালো পানিতে ডুবে যায়।” তাঁদের প্রশ্ন: যেটা বৈজ্ঞানিকভাবে ঘটেই না, সেটা কুরআনে কেন এভাবে বর্ণিত হলো?

৩. সারকথা

অভিযোগটির মূল বক্তব্য হলো — কুরআন যদি আল্লাহর বাণী হয় এবং কুরআন যদি সর্বজ্ঞ সত্তার রচনা হয়, তাহলে সেখানে এমন কথা থাকবে কেন, যা বৈজ্ঞানিকভাবে অসত্য? সূর্য কখনো পানিতে ডোবে না — এটা সর্বজনবিদিত। অতএব, এই আয়াত কুরআনের অবৈজ্ঞানিকতার প্রমাণ।

দ্বিতীয় অংশ: অভিযোগের যৌক্তিক ও ভাষাতাত্ত্বিক জবাব

 ১. “সূর্যাস্ত” — একটি সর্বজনস্বীকৃত রূপক প্রকাশ

এই বিতর্কের সবচেয়ে কার্যকর জবাবটি পাওয়া যায় আমাদের দৈনন্দিন ভাষাব্যবহারের মধ্যেই।

একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের সাথে সূর্যাস্ত দেখছেন

একজন বিজ্ঞানের অধ্যাপক যখন বলেন, “চলো, সূর্যাস্ত দেখতে যাই” — তখন কি তিনি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে সূর্য অস্ত যাচ্ছে? অবশ্যই না। তিনি জানেন এটা পৃথিবীর ঘূর্ণনের ফল। তবু তিনি “সূর্যাস্ত” শব্দটি ব্যবহার করেন — কারণ এটি একটি প্রচলিত, সহজবোধ্য এবং শ্রুতিমধুর প্রকাশভঙ্গি।

যদি বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল করে বলতে হতো, তাহলে বলতে হতো: “চলো, পৃথিবী গোলার্ধের যে অংশে বাংলাদেশের অবস্থান, সে অংশটি সূর্যের ঠিক বিপরীত দিকে মুখ নিতে চলেছে — সেই দৃশ্যটা অবলোকন করে আসি।” এভাবে বললে বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে নির্ভুল হতো বটে, কিন্তু ভাষা তার মাধুর্য, সৌন্দর্য এবং যোগাযোগের সরলতা হারাত।

এক শব্দের “সূর্যাস্ত” দিয়ে যা বোঝানো যায়, তার জন্য একটি পুরো বাক্যের প্রয়োজন হতো। তাই সংক্ষেপের স্বার্থে, ভাষার মাধুর্যের স্বার্থে এবং মানুষের বোঝার সুবিধার স্বার্থে “সূর্যাস্ত” শব্দটি ব্যবহার করা হয় — এবং সবাই তা বোঝে।

“The Sun rises in the east and sets in the west.”

এটিকে বলা হয় Universal Truth বা চিরন্তন সত্য। অথচ বৈজ্ঞানিকভাবে সূর্য উঠেও না, ডোবেও না। তারপরেও এই বাক্যটিকে কেউ অবৈজ্ঞানিক বলে না, কারণ সবাই জানে এটি একটি পর্যবেক্ষণমূলক ও রূপক প্রকাশভঙ্গি — আক্ষরিক বিবৃতি নয়।

তাহলে প্রশ্ন হলো: একই ধরনের প্রকাশভঙ্গি মানুষের ভাষায় ব্যবহার হলে সেটা গ্রহণযোগ্য, কিন্তু কুরআনে থাকলে সেটা অবৈজ্ঞানিক — এই দ্বৈত মানদণ্ডের যৌক্তিক ভিত্তি কী?

২. কুরআনের বর্ণনা: জুলকারনাঈনের দৃষ্টিকোণ থেকে

সূরা কাহাফের ৮৬ নম্বর আয়াতটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে বোঝা যায় — এটি আল্লাহর নিজের বৈজ্ঞানিক বিবরণ নয়। এটি জুলকারনাঈন নামক ব্যক্তির দৃষ্টিতে যা দেখা গিয়েছিল তার বর্ণনা।

সূর্য জলাশয়ে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য

জুলকারনাঈন সমুদ্রের তীরে পৌঁছেছিলেন। সেখান থেকে তিনি সূর্যকে দেখছিলেন। সাগরের দিগন্তে সূর্যের অস্তগমনের যে দৃশ্য, তা দেখে স্বাভাবিকভাবেই মনে হওয়ার কথা যে সূর্যটি পানির মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। এটিই একজন মানুষের চর্মচক্ষুর পর্যবেক্ষণ। আর কুরআন সেই পর্যবেক্ষণের ভাষাতেই বিষয়টি বর্ণনা করেছে।

কুরআন বলেনি যে সূর্য সত্যিই পানিতে ডুবে গেছে বা সূর্যের গন্তব্য পানির নিচে। কুরআন বলেছে — জুলকারনাঈন সেখানে গিয়ে সূর্যকে পানিতে ডুবে যেতে দেখলেন। এটি দ্রষ্টার অভিজ্ঞতার বর্ণনা, জ্যোতির্বিদ্যার সংজ্ঞা নয়।

৪. ভাষার দুটি স্তর: আক্ষরিক ও রূপক

ভাষাবিজ্ঞানে দুটি স্তর আছে — আক্ষরিক (Literal) ও রূপক (Figurative)। “সূর্যাস্ত” শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়, আক্ষরিক অর্থে নয়। একইভাবে, সূরা কাহাফের এই আয়াতটি জুলকারনাঈনের দৃশ্যমান অভিজ্ঞতাকে ভাষায় ধারণ করে — এটি কোনো জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দাবি নয়।

বিজ্ঞানের অধ্যাপক যেমন বলতে পারেন “সূর্যাস্ত দেখব” — পুরোপুরি জেনেবুঝে যে সূর্য অস্ত যায় না — ঠিক তেমনি কুরআনও মানুষের পরিচিত ভাষায়, মানুষের পর্যবেক্ষণের ভাষায় একটি ঘটনার বিবরণ দিয়েছে।

৫. প্রাসঙ্গিক বিষয়: কুরআনের উদ্দেশ্য কী?

কুরআন কোনো বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়। কুরআন মানবজাতির হেদায়েতের জন্য নাজিল হওয়া একটি গ্রন্থ। এতে বৈজ্ঞানিক ইশারা আছে, কিন্তু কুরআনের ভাষা সাধারণ মানুষের বোধগম্য ভাষায় রচিত — কারণ সর্বকালের সর্বস্তরের মানুষের কাছে এই বার্তা পৌঁছে দেওয়াই এর লক্ষ্য।

যদি কুরআন সরাসরি বলত: “পৃথিবীর অক্ষীয় ঘূর্ণনের কারণে দিগন্তের ওপারে সূর্যের আলো অদৃশ্য হয়ে যায়” — তাহলে সপ্তম শতাব্দীর আরবের মানুষ, বা পরবর্তী শতাব্দীর অনেক মানুষই হয়তো তা বুঝতে পারত না।

কুরআন তাই মানুষের পরিচিত অভিজ্ঞতার ভাষায় কথা বলে — এবং সেটি করা একটি অত্যন্ত সচেতন ও বুদ্ধিমান কৌশল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Logic Tv (বাংলা)

Quick Links

Contacts

You can let us know any comments, questions or suggestions through the following:

© 2026 Logic TV — All Rights Reserved.