মানবসভ্যতার ইতিহাসে জ্যোতির্বিজ্ঞান একটি দীর্ঘ গবেষণার ফল। আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা আজ মহাবিশ্বের উৎপত্তি, গঠন ও গতিপথ সম্পর্কে অনেক তথ্য জানতে পেরেছি। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো—চৌদ্দশ বছর আগে অবতীর্ণ আল-কোরআনে এমন সব তথ্য উল্লেখ রয়েছে, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে অবিশ্বাস্যভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই প্রবন্ধে আমরা কোরআনের বর্ণনা এবং আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের আবিষ্কৃত তথ্যের তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করছি।
১. বিগ ব্যাং তত্ত্ব ও কোরআনের ব্যাখ্যা
“বিগ ব্যাং” তত্ত্ব অনুযায়ী—
মহাবিশ্ব শুরু হয়েছিল একটি একক বিন্দু (সিঙ্গুলারিটি) থেকে। সেই বিন্দু বিস্ফোরণের মতো সম্প্রসারণ শুরু করলে সৃষ্টি হয় অসংখ্য ছায়াপথ, নক্ষত্র, গ্রহ ও মহাজাগতিক উপাদান।
কোরআনে ঠিক এ বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে—
“অবিশ্বাসীরা কি চিন্তা করে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী মিলিত অবস্থা ছিল—আমি তাদের পৃথক করেছি?”
— সূরা আম্বিয়া ২১:৩০
বিগ ব্যাং তত্ত্বের মূল ধারণাটি হলো—
- শুরুতে সবকিছু একত্রিত ছিল
- পরে তা বিস্ফোরণ/বিস্তার হয়ে পৃথক হয়েছে
কোরআনের আয়াতটি এই ধারণার সঙ্গেই পুরোপুরি মিলে যায়।
২. মহাবিশ্বের প্রথম অবস্থা: ধোঁয়া বা গ্যাসীয় মেঘপুঞ্জ
বিজ্ঞানীদের মতে—মহাবিশ্বের প্রাথমিক অবস্থা ছিল ধোঁয়াটে (Smoke-like gas cloud)।
কোরআনে বলা হয়েছে—
“তিনি আকাশের দিকে লক্ষ্য করলেন—এ সময় তা ছিল ধোঁয়া।”
— সূরা ফুসসিলাত ৪১:১১
এ আয়াতটি বিগ ব্যাংয়ের পরের গ্যাস–ধোঁয়া অবস্থাকে সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ করে।
৩. পৃথিবী গোলাকার — কোরআনের বর্ণনা
ইতিহাসে বহু যুগ ধরে মানুষ বিশ্বাস করত পৃথিবী সমতল। কিন্তু কোরআন পৃথিবীর গোলাকৃতি সম্পর্কে ইঙ্গিত দিয়েছিল।
দিন-রাতের ক্রমাগত পরিবর্তন
“আল্লাহ রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে প্রবিষ্ট করেন।”
— সূরা লুকমান ৩১:২৯
এখানে “প্রবিষ্ট করা” (ইউকাওয়ারি) শব্দটি গড়িয়ে জড়ানোর অর্থ প্রকাশ করে—যা কেবল গোলাকার বস্তুর ক্ষেত্রেই সম্ভব।
উটপাখির ডিমের আকৃতি
“তিনি পৃথিবীকে দাহাহা করেছেন।”
— সূরা নাযিয়াত ৭৯:৩০
আরবি দাহাহা শব্দের মূল অর্থ—উটপাখির ডিম।
উটপাখির ডিম হুবহু পৃথিবীর মত চ্যাপ্টা গোলাকার (Oblate Spheroid)।
৪. চাঁদের আলো প্রতিফলিত – কোরআনের নিখুঁত বক্তব্য
অতীতে মানুষ মনে করত চাঁদ নিজে আলো উৎপন্ন করে।
বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে—চাঁদ সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে।
কোরআনে বলা হয়েছে—
“তিনি সূর্যকে প্রদীপ এবং চাঁদকে আলোযুক্ত করেছেন।”
— সূরা ইউনুস ১০:৫
সূর্যের জন্য ব্যবহৃত শব্দ “সিরাজ/ওহহাজ”—জ্বালানিযুক্ত আলো।
চাঁদের জন্য “নূর/মুনির”—প্রতিফলিত আলো।
এই পার্থক্য ১৪০০ বছর আগে বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিকভাবে উল্লেখ করা ছিল এক বিস্ময়!
৫. সূর্যের নিজস্ব অক্ষে আবর্তন—কোরআনের ঘোষণা
একসময় ধারণা ছিল সূর্য স্থির। পরে বিজ্ঞান প্রমাণ করে, সূর্য নিজ অক্ষের ওপর আবর্তিত হয়।
কোরআনে বলা হয়েছে—
“সূর্য ও চন্দ্র—সবাই নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটছে।”
— সূরা আম্বিয়া ২১:৩৩
“ইয়াসবাহুন” শব্দটি সাঁতার কাটার মতো ঘূর্ণনসহ গতিকে নির্দেশ করে।
এটি সূর্যের আবর্তন + পরিক্রমণ উভয়কেই নির্দেশ করে।
৬. সূর্যের আয়ু সীমিত—একসময় নিভে যাবে
বিজ্ঞান বলে—
সূর্যের হাইড্রোজেন জ্বালানি শেষ হলে একদিন এটি নিভে যাবে।
কোরআন বলছে—
“সূর্য নির্ধারিত সময় পর্যন্তই পরিভ্রমণ করবে।”
— সূরা ইয়াসীন ৩৮
এ আয়াত সূর্যের একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা আছে—এ কথাই প্রকাশ করে।
৭. মহাবিশ্ব সম্প্রসারণশীল
১৯২৯ সালে এডউইন হাবল আবিষ্কার করেন—মহাবিশ্ব ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে।
কোরআন বলছে—
“আমি আকাশকে শক্তি দিয়ে নির্মাণ করেছি এবং আমি এটিকে সম্প্রসারিত করছি।”
— সূরা যারিয়াত ৫১:৪৭
মহাবিশ্ব যে বিস্তৃত হচ্ছে—এটি আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কার, কিন্তু কোরআনে তা বহু আগে থেকেই উল্লেখ আছে।
৮. মহাবিশ্বের বাইরে পদার্থের উপস্থিতি
আজকের বিজ্ঞান বলে—
ছায়াপথের বাইরে ডার্ক ম্যাটার, প্লাজমা, গ্যাস, ধূলিকণা ইত্যাদি রয়েছে।
কোরআনে বলা আছে—
“তিনি সৃষ্টি করেছেন আকাশ, পৃথিবী এবং যা কিছু এ দুটির মাঝে রয়েছে।”
— সূরা ফুরকান ২৫:৫৯
অর্থাৎ—মহাশূন্য শূন্য নয়; সেখানে পদার্থের অস্তিত্ব আছে—যা আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান আজ প্রমাণ করেছে।
উপসংহার
কোরআন কোনো বিজ্ঞানগ্রন্থ নয়; তবুও এতে উল্লেখিত অসংখ্য তথ্য আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গে এক অদ্ভুত সামঞ্জস্য প্রকাশ করে।
এগুলো প্রমাণ করে—
- কোরআনের বাণী মানব রচিত নয়।
- এর জ্ঞান মানবজ্ঞানকে ছাড়িয়ে যায়।
- মহাবিশ্বের প্রকৃত বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।






1 Comment
Thanks