মানবসভ্যতার ইতিহাসে বহু শতাব্দী আগেই কোরআন প্রাণীদের আচরণ, সামাজিক গঠন ও জীবনধারার বহু বিস্ময়কর তথ্য তুলে ধরেছে—যা আধুনিক গবেষণা দ্বারা আজ প্রমাণিত। এই নিবন্ধে পশু-পাখি, মৌমাছি, পিঁপড়া, মাকড়সা ও তাদের আচরণ সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিজ্ঞান যা বলে—দুটি দিকই তুলে ধরা হলো।

পশুপাখিদের দলবদ্ধ জীবন — কোরআনের ঘোষণা
আধুনিক গবেষণায় স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে পশু-পাখিরা দলবদ্ধভাবে (social groups) বসবাস করে, সমন্বিতভাবে কাজ করে এবং নিজেদের সমাজে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখে।
কোরআন বলছে—
অর্থ:
“আর পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রকার প্রাণী রয়েছে এবং যত প্রকার পাখি দুই ডানাযুক্ত হয়ে উড়ে বেড়ায়—তারা সবাই তোমাদের মতোই এক-একটি সম্প্রদায় বা গোষ্ঠী।”
— (সূরা আনআ’ম: ৩৮)
এই আয়াতটি ১৪ শতাব্দী আগে বলেছিল যে সব প্রাণীরই নিজস্ব কমিউনিটি রয়েছে—যা আধুনিক জীববিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

পাখিদের শূন্যে ভেসে থাকার বিস্ময়
পাখিরা কীভাবে আকাশে থাকে, কীভাবে ডানা মেলে ও গুটিয়ে উড়ে যায়—এ বিষয়ে কোরআন বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
অর্থ:
“তারা কি পাখিদের দিকে দেখে না—আকাশের শূন্যালোকে তারা কীভাবে নিয়ন্ত্রিত রয়েছে? আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ছাড়া কে তাদের ধরে রেখেছে? নিশ্চয়ই এতে অনেক নিদর্শন আছে বিশ্বাসীদের জন্য।”
— (সূরা নাহল: ৭৯)
আরেক আয়াতে বলা হয়েছে—
অর্থ:
“তারা কি তাদের ওপর উড়ন্ত পাখিদের লক্ষ্য করে না—যেগুলো পাখা বিস্তার করে এবং গুটিয়ে নেয়? মহান রহমান আল্লাহ ছাড়া তাদের কেউ ধরে রাখে না।”
— (সূরা মুল্ক: ১৯)
পাখিরা বাতাসের চাপ, “airfoil wing design”, এবং স্নায়বিক নির্দেশনা মেনে চলে। গন্তব্য নির্ধারণে তাদের জিনগত নেভিগেশন সিস্টেম আছে—যা বিজ্ঞান সম্প্রতি উদ্ঘাটন করেছে।
প্রফেসর হ্যামবার্গারের গবেষণায় দেখা গেছে, যেমন মাটন বার্ড মাত্র ৬ মাসে ১৫,০০০ মাইল উড়ে আবার একই জায়গায় ফিরে আসে—যা তাদের দারুণ অভীন্তরীণ ন্যাভিগেশন ক্ষমতার প্রমাণ। কোরআনের আয়াতগুলো এ বিস্ময়কর সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণের দিকেই ইঙ্গিত করে।

মৌমাছির সামাজিক জীবন ও নিখুঁত যোগাযোগ—কোরআনের বর্ণনা
নোবেল বিজয়ী ভন-ফ্রিশ আবিষ্কার করেছিলেন, মৌমাছিরা “ডান্স ল্যাঙ্গুয়েজ” ব্যবহার করে অন্যান্য মৌমাছিকে ফুলের অবস্থান জানায়।
কোরআন বলছে—
অর্থ:
“এবং তোমার রব মৌমাছিকে প্রত্যাদেশ করলেন—তারা যেন পাহাড়-পর্বত, গাছপালা এবং মানব-গৃহে তাদের বাসা বাঁধে। তারপর প্রত্যেক ফল থেকে ভক্ষণ কর এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে তোমার রবের নির্ধারিত পথে চলতে থাক।”
— (সূরা নাহল: ৬৮–৬৯)
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
মৌমাছির জন্য আয়াতে যে ক্রিয়ারূপ ব্যবহৃত হয়েছে তা স্ত্রীলিঙ্গ। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, খাদ্য সংগ্রহকারী এবং কর্মী মৌমাছি—সবাই স্ত্রী মৌমাছি।
১৪০০ বছর আগে কোরআন এই সত্যটি নির্দেশ করেছে—যা মানুষ জানত না।

মাকড়সার জাল—বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা
মাকড়সার জাল খুব শক্ত মনে হলেও বাস্তবে তা অতি দুর্বল ও ক্ষণভঙ্গুর। শুধু তাই নয়, মাকড়সার পারিবারিক সম্পর্কও দুর্বল; স্ত্রী মাকড়সা প্রায়ই পুরুষটিকে মেরে ফেলে।
কোরআন বলেছে—
অর্থ:
“যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে পৃষ্ঠপোষক গ্রহণ করে তাদের দৃষ্টান্ত মাকড়সার মতো; সে নিজের জন্য একটি ঘর তৈরি করে। আর সব ঘরের মধ্যে মাকড়সার ঘরই সবচেয়ে ভঙ্গুর—যদি তারা তা জানত।”
— (সূরা আনকাবুত: ৪১)
এ আয়াতটি শুধু জালের ভঙ্গুরতা নয়—মাকড়সার পরিবার ব্যবস্থার দুর্বলতাও ইঙ্গিত করে। আধুনিক গবেষণা বলছে, স্ত্রী মাকড়সা মিলনের পর পুরুষকে খেয়ে ফেলে—যা আয়াতের রূপককে আরও শক্তভাবে ব্যাখ্যা করে।

পিঁপড়ার সংগঠন, যোগাযোগ ও বুদ্ধিমত্তা—কোরআনের চমকপ্রদ বর্ণনা
পিঁপড়ার জীবনধারা নিয়ে কোরআন অত্যন্ত সূক্ষ্ম বর্ণনা দিয়েছে—
অর্থ:
“…একটি পিপীলিকা বলল—হে পিপীলিকাদের দল! তোমরা তোমাদের গৃহে প্রবেশ কর, অন্যথায় সুলাইমান ও তাঁর সৈন্যরা তোমাদের পিষে ফেলবে, অথচ তারা টেরও পাবে না।”
— (সূরা নামল: ১৭–১৮)
প্রাচীন যুগে মানুষ এই আয়াত নিয়ে উপহাস করত—“পিঁপড়া কথা বলে নাকি!”
কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ দিয়েছে:
পিঁপড়ার আচরণ ও সমাজ কাঠামো
১. মৃত পিঁপড়াকে কবর দেওয়া – তারা মৃতদেহ সরিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে ফেলে।
২. শ্রম বিভাজন – কর্মী, ব্যবস্থাপক, সৈন্য, খাদ্য সংগ্রাহক—সম্পূর্ণ সংগঠিত সমাজ।
৩. যোগাযোগ ব্যবস্থা – রাসায়নিক ভাষা (pheromones) দ্বারা উন্নত বার্তা আদান-প্রদান।
৪. একত্রে গল্প-গুজব বা সামাজিকতা – দলবদ্ধ কম্পন ও সিগন্যালে যোগাযোগ।
৫. বাজারমুখী আচরণ – খাদ্য বিনিময়, ট্রেড-লাইক সহযোগিতা।
৬. খাদ্য মজুত ও সংরক্ষণ – খাদ্যে অঙ্কুর বের হলে কেটে ফেলে; স্যাঁতসেঁতে হলে রোদে শুকায়—যেন ছোট্ট কৃষিবিদ।
এই জ্ঞান মানবজাতি কেবল সাম্প্রতিক শতাব্দীতে পেয়েছে—কোরআন বহু আগেই এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে।
উপসংহার
প্রাণীবিজ্ঞান আজ যেসব তথ্যকে প্রমাণসহ মানুষের সামনে তুলে ধরছে, কোরআন সেই সত্যগুলোর প্রতি ১৪০০ বছর আগেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। পাখিদের উড্ডয়ন, মৌমাছির নেভিগেশন, পিঁপড়ার সংগঠন, মাকড়সার দুর্বল সমাজব্যবস্থা—এসবই আধুনিক বিজ্ঞানের আবিষ্কারের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে মিল খুঁজে পায়।
কোরআন মানুষের জন্য শুধু নৈতিক বা আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনা নয়—বৈজ্ঞানিক চিন্তারও উৎস।





