জীবহত্যা নির্মম কাজ, তবু মুসলমানরা কেন (আমিষ খাদ্য) মাংস খায়?

বর্তমানে নিরামিষ খাদ্যগ্রহণ বিশ্বব্যাপী একটি আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। অনেকেই মনে করেন যে প্রাণী হত্যা নির্মম কাজ এবং মাংস না খাওয়াই নৈতিকতার পরিচয়। কিন্তু ইসলাম জীবজগতের উপর দয়া করতে শেখালেও মানুষের জন্য আল্লাহ যে নেয়ামত দিয়েছেন—তা সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবহার করার অনুমতিও দিয়েছেন। তাই মুসলিমরা কেন মাংস খায়—এ প্রশ্নের জবাব যুক্তি, বিজ্ঞান ও ধর্মীয় দলিলের আলোকে বিশ্লেষণ করা হলো।

১. মুসলমান নিরামিষভোজী হলেও পূর্ণ মুসলমান থাকতে পারে

ইসলামে কাউকে বাধ্য করা হয়নি যে অবশ্যই মাংস খেতেই হবে।
একজন মুসলমান সবজি-খাদক (Vegetarian) হয়েও সম্পূর্ণভাবে একজন উত্তম মুসলমান হতে পারে।

Meat

২. কোরআন মজীদ মাংস ভক্ষণের অনুমতি দিয়েছে

আল্লাহ তাআলা বলেন—


অর্থ: “এবং তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুসমূহের মধ্যে চিন্তা করার বিষয় আছে। আমি তোমাদেরকে তাদের উদরস্থিত বস্তু থেকে পান করাই এবং তোমাদের জন্য তাদের মধ্যে প্রচুর উপকারিতা আছে। তোমরা তাদের কতককে ভক্ষণ করো।”
(সূরা মু’মিনুন: ২১)

এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে আল্লাহ মানুষকে পশুর উপকারিতা গ্রহণ ও ভক্ষণ করার অনুমতি দিয়েছেন।

৩. মাংস মানুষের শরীরের বিকাশে উপকারী খাদ্য

মাংস উচ্চমানের প্রোটিনের উৎস।
মাংসে থাকা প্রয়োজনীয় আট ধরনের এমিনো অ্যাসিড মানুষের শরীর স্বাভাবিকভাবে একত্রে তৈরি করতে পারে না—যা মাংস খাওয়ার মাধ্যমে সহজেই পাওয়া যায়। এছাড়া এতে রয়েছে—

  • আয়রন
  • ভিটামিন-বি
  • নিয়াসিন
    ইত্যাদি।

Human teeth

৪. মানুষের দাঁতের গঠনই প্রমাণ করে—মানুষ সবধরনের খাদ্যগ্রহণে সক্ষম

যেমন—

  • শুধুমাত্র সবজি-খাদক প্রাণীর দাঁত চ্যাপটা (Flat teeth)
  • শুধুমাত্র মাংসাশী প্রাণীর দাঁত সূচালো ও ধারালো

অন্যদিকে মানুষের দাঁতে চ্যাপটা ও সূচালো—দুটি ধরনের দাঁতই আছে, যা স্পষ্ট করে যে মানুষ সজিখাদক ও মাংসখাদক—উভয় হতে পারে। এটি আল্লাহর সৃষ্টি-প্রকৃতির অংশ।

৫. মানুষের পরিপাকতন্ত্র সজি ও মাংস উভয়ই হজম করতে সক্ষম

তৃণভোজী প্রাণী শুধু ঘাস-পাতা হজম করতে পারে, আর মাংসাশী প্রাণী কেবল মাংস।
কিন্তু মানুষের পাকস্থলি এমনভাবে তৈরি—যা সবজি ও মাংস উভয়ই পরিপাক করতে পারে।
যদি মানুষকে কেবল নিরামিষভোজী বানানো হতো, তাহলে আল্লাহ মানুষের পরিপাকতন্ত্র এমনভাবে বানাতেন না।

৬. হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থেও মাংস ভক্ষণের অনুমতি রয়েছে

যদিও কিছু হিন্দু কঠোর নিরামিষভোজী, তবু তাদের ধর্মগ্রন্থে মাংস খাওয়ার অনুমতি বিদ্যমান।

(ক) রামচন্দ্রের মাংস ভক্ষণ

অযোধ্যা খণ্ডের ২০:২৬ এবং ৯৪ শ্লোকে উল্লেখ আছে—
রাম বনবাসে যাওয়ার সময় তাঁর প্রিয় মাংস দিয়ে রান্নার কথা বলেছেন।

(খ) সীতার হরিণ শিকার প্রসঙ্গ

রামায়ণে উল্লেখ আছে, সীতা রামকে হরিণ শিকারের জন্য বলেন।
এর একমাত্র যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা হলো—সীতার মাংস খেতে চাওয়া।
যদি রাম ও সীতা মাংস খেতে পারেন, তাহলে অন্য হিন্দুদের পক্ষে মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ নেই।

৭. হিন্দুর নিরামিষ ধারণা জৈন ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত

হিন্দুদের অনেক অংশ নিরামিষকে ধর্মীয় বিধান মনে করলেও—
প্রকৃতপক্ষে তারা জৈন ধর্মের ‘জীবহিংসা-বিরোধী’ ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে।
হিন্দু ধর্মগ্রন্থে নিজস্বভাবে মাংস নিষিদ্ধ নয়।

vegetables

৮. উদ্ভিদজগতেরও প্রাণ আছে

আগে ধারণা ছিল গাছপালা প্রাণহীন।
কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত—উদ্ভিদেরও প্রাণ আছে।
সুতরাং প্রাণ হত্যা না করে নিরামিষ খেয়ে থাকা—এ যুক্তিও অযৌক্তিক।

৯. উদ্ভিদের ব্যথা অনুভূতি রয়েছে

অনেক নিরামিষভোজী যুক্তি দেয়—গাছ ব্যথা পায় না।
কিন্তু বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে—
উদ্ভিদেরও যন্ত্রণা, আনন্দ, শোক—সব অনুভূতি রয়েছে।

মানুষ ২০–২০,০০০ হার্জ পর্যন্ত শব্দ শুনতে পারে।
উচ্চ বা নিম্ন মানের শব্দ মানুষের কানে না গেলেও—যন্ত্রের মাধ্যমে উদ্ভিদের “ব্যথার শব্দ” শোনা যায়।

১০. কম ইন্দ্রিয় সম্পন্ন প্রাণী হত্যা ছোট পাপ—এ যুক্তি অযৌক্তিক

কেউ কেউ বলে—উদ্ভিদের কম ইন্দ্রিয়, তাই হত্যা করলে পাপ কম।
এটা সম্পূর্ণ ভুল যুক্তি।
কারণ, একজন বধির-মূক মানুষকে হত্যা করলে কি তার হত্যাকারীর শাস্তি কম হবে?
জীব হত্যা জীব হত্যা—ইন্দ্রিয়ের সংখ্যায় অপরাধ কমে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন—


অর্থ: “হে লোকসকল! পৃথিবীতে যা কিছু হালাল পবিত্র খাদ্যবস্তু আছে, সেগুলো তোমরা খাও।”
(সূরা বাকারা: ১৬৮)

Cows

১১. গৃহপালিত পশুর বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে মাংস মানুষের জন্য উপকারী

যদি পৃথিবীর সব মানুষ নিরামিষভোজী হয়ে যায়—
গৃহপালিত পশুর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাবে।
কারণ তাদের প্রজননক্ষমতা অত্যন্ত বেশি।
আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি-জগতকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে—এ বিষয়ে সর্বজ্ঞ।

উপসংহার

ইসলাম মানুষের জন্য যা হালাল করে দিয়েছে—সেটি গ্রহণ করা বৈধ ও যুক্তিসঙ্গত।
মাংস ভক্ষণ ইসলাম, বিজ্ঞান বা যৌক্তিকতার পরিপন্থী নয়।
বরং মানুষের শারীরিক গঠন, পরিপাকতন্ত্র, খাদ্যের প্রয়োজন এবং ধর্মীয় দলিল—সবই প্রমাণ করে যে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সর্বভুক (Omnivore)।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2025 Logic TV — All Rights Reserved.