“অতঃপর যখন নিষিদ্ধ মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও হত্যা কর এবং তাদেরকে পাকড়াও কর, তাদেরকে অবরোধ কর এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে বসে থাক। তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
(সূরা তওবা: ৫)
প্রশ্নটা কোথায়?
এই একটি আয়াতকে সামনে এনে বহু সময় কুরআনের বিরুদ্ধে একটি গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়—ইসলাম নাকি মানুষকে অমুসলিমদের যেখানেই পাবে হত্যা করতে শেখায়। অথচ, ইতিহাস, আয়াতের প্রেক্ষাপট এবং কুরআনের সামগ্রিক নীতিমালা বিবেচনা করলে এই অভিযোগ টেকসই হয় না।
এই বিষয়টি বোঝার জন্য আমরা একটি পরিচিত ঐতিহাসিক উদাহরণ দিয়ে আলোচনা শুরু করতে পারি।
১৯৭১: অত্যাচারের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নেওয়ার ইতিহাস
১৯৭১ সাল। পশ্চিম পাকিস্তানের হাতে নির্যাতিত, নিপীড়িত বাঙালি জাতি। যখনই তারা নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের কথা বলেছে, তখনই তাদের উপর নেমে এসেছে ভয়াবহ দমন-পীড়ন। এক পর্যায়ে এই নির্যাতনের মাত্রা এতটাই ভয়ংকর হয়ে ওঠে যে, বাঙালিরা নিজেদের অস্তিত্ব ও মাতৃভূমি রক্ষার জন্য অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য হয়।

মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার ডাক দেন। তিনি বলেন—
“প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। ”
এই বক্তব্য কি সন্ত্রাসে উস্কানি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে? ইতিহাস বলে—না। বরং এটি বাঙালি জাতির আত্মরক্ষার এক ন্যায়সঙ্গত ঘোষণা হিসেবেই স্বীকৃত।
তাহলে প্রশ্ন আসে—দ্বৈত মানদণ্ড কেন?
যদি নির্যাতিত বাঙালিদের জন্য যুদ্ধের ডাক ন্যায়সঙ্গত হয়, তবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে, অন্য সময়ে নির্যাতিত মানুষের জন্য একই ধরনের যুদ্ধ ঘোষণা কেন ‘সন্ত্রাসবাদ’ হয়ে যায়?
চে গুয়েভারা, মাও সে তুং কিংবা জোসেফ স্ট্যালিন—এদের অনেকের সংগ্রামকে বিশ্ববাসী ‘নিপীড়িতের অধিকার আদায়ের লড়াই’ হিসেবে দেখে। অথচ একই প্রেক্ষাপটে ইসলামের ইতিহাসকে ভিন্ন চোখে দেখা হয় কেন?
১৪০০ বছর আগের আরব: নির্যাতনের বাস্তবতা
১৪ শতাব্দী আগে আরব উপদ্বীপে একটি নতুন ধর্মীয় বিশ্বাস আত্মপ্রকাশ করে। বহু মানুষ স্বেচ্ছায় এই বিশ্বাস গ্রহণ করে। কিন্তু তৎকালীন সমাজপতি ও ক্ষমতাবান গোষ্ঠী এটি মেনে নিতে পারেনি।
ফলাফল ছিল ভয়াবহ:
- বুকের উপর পাথর চাপা দেওয়া
- মরুভূমিতে রশি বেঁধে টেনে নেওয়া
- হত্যা, নির্যাতন ও সামাজিক বয়কট
- নবী মুহাম্মদ (সা.) ও তাঁর অনুসারীদের দেশছাড়া করা
এই পরিস্থিতিতে মুসলমানরা ছিলেন ঠিক তেমনই নির্যাতিত, যেমন ১৯৭১ সালে বাঙালিরা ছিল।
সূরা তওবা আয়াত ৫: যুদ্ধকালীন নির্দেশ
এই আয়াত নাজিল হয় একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে—
- মুশরিকরা বারবার চুক্তি ভঙ্গ করেছিল
- মুসলমানদের উপর আক্রমণ চালিয়েছিল
- চারটি নিষিদ্ধ মাস শান্তির জন্য নির্ধারিত ছিল
এই চার মাস শেষ হওয়ার পরও যারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল, শুধুমাত্র তাদের বিরুদ্ধেই এই নির্দেশ। এটি কোনো সাধারণ নাগরিক বা শান্তিপ্রিয় অমুসলিমদের জন্য নয়।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই আয়াতের পরের আয়াত।
“আর অংশীবাদীদের মধ্যে কেউ তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে তুমি তাকে আশ্রয় দাও, যাতে সে আল্লাহর বানী শুনতে পায়। অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দাও। তা এ জন্য যে তারা অজ্ঞ লোক।”
(সূরা তওবা: ৬)
বিশ্বের কোন যুদ্ধনীতিতে শত্রুপক্ষের জন্য এমন মানবিক নিরাপত্তার নির্দেশ পাওয়া যায়?
কুরআনের সামগ্রিক নীতি: হত্যা নয়, ন্যায়বিচার
কুরআন কোথাও নির্বিচারে হত্যার অনুমতি দেয় না। বরং স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—
“যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর, তবে বাড়াবাড়ি করো না।”
(বাকারা: ১৯০)
এবং আরও বলা হয়েছে—
“কেউ যদি বিনা অপরাধে কোন নির্দোষ ব্যক্তিকে হত্যা করে, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করলো।”
(মায়েদা: ৩২)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে, কুরআনের উদ্দেশ্য সহিংসতা নয়; বরং ন্যায়, আত্মরক্ষা ও সীমারেখা বজায় রাখা।
চূড়ান্ত কথা
মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য কখনোই কাফের নিধন নয়; উদ্দেশ্য হলো মানুষের হিদায়াত। সে কারণেই যুদ্ধের মাঝেও আশ্রয়, নিরাপত্তা ও পথ ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মুসলিমবিদ্বেষীরা যেভাবে কুরআনকে খণ্ডিতভাবে পড়ে, মুসলমানরা কুরআনকে সেভাবে বোঝে না। কুরআন বোঝার জন্য প্রয়োজন ইতিহাস, প্রেক্ষাপট এবং সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি।
উপসংহার
যদি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালির জন্য ন্যায্য হয়, তবে ১৪০০ বছর আগে নিপীড়িত মুসলমানদের আত্মরক্ষার যুদ্ধকে সন্ত্রাসবাদ বলা নিছক দ্বৈত মানদণ্ড ছাড়া কিছু নয়।





