আজকের বিশ্বে “ইসলাম নারীকে পর্দার আড়ালে রেখে অপমান করে”—এমন অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। অমুসলিম বা সেক্যুলার প্রচারমাধ্যমে ইসলামের পর্দার বিধানকে কখনো কখনো দাসত্ব বা স্বাধীনতা-বিরোধী রূপে তুলে ধরা হয়। কিন্তু পর্দা আসলে কী? কেন এটি আবশ্যক? ইতিহাস, যুক্তি, ইসলামি বিধান এবং বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়—পর্দা নারীর স্বাধীনতা খর্ব করে না, বরং তার মর্যাদা ও নিরাপত্তার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।
ইসলামের আগের পৃথিবীতে নারীর অবস্থান
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইসলাম আগমনের আগে পৃথিবীর অধিকাংশ সভ্যতায় নারী ছিল অত্যন্ত অবহেলিত, উপেক্ষিত এবং শোষিত। নিচে কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো—
১. বাবেল সভ্যতা (Babylonian Civilization)
নারীর কোনো স্বতন্ত্র অধিকার ছিল না। কেউ যদি কোনো নারীকে হত্যা করত, তাকে শাস্তি না দিয়ে বরং তার স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত—এতটাই মূল্যহীন ছিল নারীর জীবন।
২. গ্রিক বা ইউনানি সভ্যতা
যেখানে মানুষ গণতন্ত্র, দর্শন, শিল্পের কথা বলে—সেই সভ্যতায় নারীর অবস্থান ছিল অত্যন্ত নিচু।
“পেন্ডোরা” নামক একটি কল্পিত নারীকেই সমগ্র মানবজাতির দুর্ভাগ্যের মূল মনে করা হত।
সময় গড়িয়ে গ্রিক সমাজে নৈতিকতা ভেঙে পড়ে, অবৈধ যৌন সম্পর্ক, নিষিদ্ধপল্লী ও উন্মুক্ত শ্লীলতাহানি ছিল সাধারণ বিষয়।
৩. রোমীয় সভ্যতা
পুরুষ তার স্ত্রীকে হত্যা করতে পারত, এবং নিষিদ্ধপল্লী, উলঙ্গতা, যৌন উচ্ছৃঙ্খলতা ছিল সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য।
৪. মিসরীয় সভ্যতা
নারীকে “নষ্টামি” ও “শয়তানের রহস্য” হিসেবে দেখা হত।
৫. আরবের জাহেলি যুগ
ইসলামের পূর্বে আরব সমাজে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। নারীকে উত্তরাধিকার, সম্মান, নিরাপত্তা—কোনোটিই দেওয়া হত না।

ইসলাম: নারীকে সম্মান, অধিকার ও মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে
ইসলাম আগমনের পর নারীর মর্যাদা বিপ্লবীভাবে পরিবর্তিত হয়।
১৪০০ বছর আগে ইসলাম নারীকে যে অধিকার দিয়েছে, সে সময় পৃথিবীর কোনো সভ্যতা তা দিতে পারেনি।
ইসলাম নারীর জন্য শুধু পোশাকের পর্দাই নয়—চরিত্র, আচরণ, দৃষ্টিবোধ—সবকিছুর সমন্বিত সুরক্ষা ব্যবস্থা দিয়েছে।
পুরুষ ও নারীর জন্য পর্দার বিধান
পর্দা শুধু নারীর জন্য নয়—পুরুষের জন্যও পর্দার নির্দেশ আগে দেওয়া হয়েছে।
পুরুষের পর্দা (সূরা নূর: ৩০)
“(হে নবী!) মু’মিন পুরুষদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”
অতএব, প্রথম দায়িত্ব পুরুষের—দৃষ্টি নত রাখা।
নারীর পর্দা (সূরা নূর: ৩১)
“মু’মিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে… মাথার ওড়নার অংশ গ্রীবা ও বক্ষদেশে টেনে নেয়…”
এই আয়াতে স্পষ্ট নির্দেশ এসেছে—নারীর সৌন্দর্য যেন নির্দিষ্ট সীমার বাইরে প্রকাশ না পায়।
পর্দার ছয়টি মৌলিক শর্ত
ইসলামি শরীয়তের আলোকে পর্দার জন্য ছয়টি শর্ত রয়েছে—
১. শরীর আবৃত রাখা
- পুরুষ: নাভি থেকে হাঁটুর নিচ পর্যন্ত।
- নারী: মুখমণ্ডল ও হাতের পাতা ছাড়া সমস্ত শরীর আবৃত।
(অনেক ফকীহ মুখ ও হাত আবৃতকেও জরুরি মনে করেন।)
২. পোশাক ঢিলেঢালা হতে হবে
৩. পোশাক স্বচ্ছ না হওয়া
৪. পোশাক এমন না হওয়া যাতে অতিরিক্ত চাকচিক্য দিয়ে দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়
৫. বিপরীত লিঙ্গের পোশাকের অনুকরণ না হওয়া
৬. ভিন্ন ধর্মীয় পরিচয়ের পোশাকের অনুকরণ না হওয়া
পর্দা কেবল বাহ্যিক নয়—চরিত্র ও আচরণও এতে অন্তর্ভুক্ত
দৃষ্টি, আচরণ, নিয়ত, কথাবার্তা—সবই পর্দার অংশ।
পোশাকে পর্দা থাকলেও যদি দৃষ্টিবোধে পর্দা না থাকে, তবে পর্দা সম্পূর্ণ হয় না।
কোরআনের দৃষ্টিতে পর্দার কারণ
সূরা আহযাব: ৫৯
“তারা যেন তাদের চাদর নিজেদের উপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে এবং তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না।”
অর্থাৎ পর্দা নারীর পরিচয় ও সম্মানের প্রতীক এবং তাকে উৎপীড়ন থেকে রক্ষা করে।
যমজ দুই বোনের উদাহরণ
একজন বোন সম্পূর্ণ ইসলামী পর্দায়, অন্যজন মিনি স্কার্টে।
রাস্তার লম্পটরা কাকে উত্ত্যক্ত করবে?
সাধারণ বাস্তবতা হলো—যার পোশাক দৃষ্টি আকর্ষণ করে তাকেই বেশি টার্গেট করা হয়।
এটি প্রমাণ করে—পর্দা যৌন হয়রানি কমাতে কার্যকর।
ধর্ষণের শাস্তি: ইসলামের কঠোর অবস্থান
যে ব্যক্তি ধর্ষণের মতো অপরাধ করে, তার জন্য কঠোর শাস্তি নির্ধারিত হয়েছে।
অনেক অমুসলিমও স্বীকার করেন—তাদের পরিবার আক্রান্ত হলে তারাও কঠোর শাস্তি চাইবে।
তাহলে অন্য নারী আক্রান্ত হলে সেই শাস্তিকে “বর্বরতা” বলা কেন?
পশ্চিমা সভ্যতার নারী স্বাধীনতা—মুক্তি নাকি শোষণ?
পশ্চিমা সমাজ নারীর স্বাধীনতার নামে তাকে যৌন প্রদর্শনীতে পরিণত করেছে।
বিজ্ঞাপন, ফ্যাশন, মিডিয়া—সবখানেই নারীকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
স্বাধীনতার আড়ালে শোষণের সবচেয়ে সূক্ষ্ম রূপ লুকিয়ে আছে।
ধর্ষণ পরিসংখ্যানে পশ্চিমা দেশ এগিয়ে
১৯৯০-এর দশকের FBI রিপোর্ট অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন হাজারের বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটত।
আজও পশ্চিমা দেশে যৌন অপরাধের হার অত্যন্ত বেশি।
যদি—
- পুরুষ দৃষ্টি নত রাখত,
- নারী-পুরুষ উভয়ে ইসলামি পর্দা মানত,
- কঠোর শাস্তি কার্যকর হতো—
তাহলে অপরাধ অবশ্যই কমত।
অবশ্যই। নিচে শেষের জন্য একটি সুন্দর, যুক্তিভিত্তিক, রচনামূলক সেকশন দিচ্ছি—যেটা তোমার ব্লগের উপসংহার হিসেবে পুরো লেখাটিকে আরও শক্তিশালী করবে।
সর্বোপরি—আল্লাহর বিধানই সর্বোচ্চ জ্ঞান ও কল্যাণের উৎস
সর্বোপরি, মুসলিম জীবনের মূলনীতি হলো—আল্লাহ যেসব বিধান দিয়েছেন, সেগুলো আমরা মানি কারণ তিনি আমাদের স্রষ্টা।
আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, আমাদের প্রকৃতি, দুর্বলতা, শক্তি, চাহিদা, ঝুঁকি—সবকিছু তিনি আমাদের চেয়ে অসীমভাবে ভালো জানেন।
মানুষ সীমিত জ্ঞান নিয়ে অনুমান করে, পরীক্ষা করে, ভুল করে, আবার শেখে। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞানে নেই কোনো ভুল, নেই কোনো ঘাটতি, নেই কোনো সন্দেহ।
তাই তাঁর নির্দেশনার প্রতিটি অংশই মানুষের কল্যাণ, মর্যাদা, সম্মান, নিরাপত্তা এবং পবিত্রতা রক্ষার জন্য নির্ধারিত।
পর্দা কোনো বেঁধে রাখা নয়—এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি সুরক্ষা, সম্মান এবং পবিত্রতার ঢাল।
যেমন কোরআনে বলা হয়েছে—
“আল্লাহ তো সবকিছুই ভালো জানেন, (এবং) প্রজ্ঞাময়।”
— সূরা আল-আহযাব
একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতা হলো—
নিজের বুদ্ধির ওপরে আল্লাহর হুকুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
কারণ, আল্লাহর হুকুমের পেছনে যে গভীর জ্ঞান, যে অসীম দয়া, যে রহমত আছে—তা কখনো মানুষের চিন্তা দিয়ে পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়।
অতএব—





