স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো? 

ভূমিকা

মানুষের চিন্তার ইতিহাসে সবচেয়ে গভীর ও প্রাচীন প্রশ্নগুলোর একটি হলো— “স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো?”। এই প্রশ্নটি একদিকে যেমন দর্শন ও যুক্তির সাথে জড়িত, অন্যদিকে তেমনি আধুনিক বিজ্ঞানের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। অনেকেই মনে করেন, যদি সবকিছুর একজন সৃষ্টিকর্তা থাকে, তাহলে সেই সৃষ্টিকর্তারও নিশ্চয় একজন স্রষ্টা থাকা উচিত। কিন্তু এই ধারণাটি কি আদৌ যৌক্তিক? বিজ্ঞান ও যুক্তির আলোকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে আমরা ভিন্ন এক বাস্তবতায় পৌঁছাই।

এই লেখায় আমরা ধাপে ধাপে আলোচনা করবো—

  • স্রষ্টার জন্য সৃষ্টিকর্তা প্রয়োজন কি না
  • মহাবিশ্ব চিরন্তন নাকি সৃষ্ট
  • থার্মোডাইনামিক্স ও বিগ ব্যাং তত্ত্ব কী বলে
  • Laws of Causality বা কার্যকারণ নীতির সীমাবদ্ধতা

স্রষ্টার কি সৃষ্টিকর্তা থাকতে পারে?

বাই ডেফিনিশন (সংজ্ঞা অনুযায়ী), স্রষ্টার কোনো সৃষ্টিকর্তা থাকতে পারে না। যদি বলা হয়— X স্রষ্টাকে সৃষ্টি করেছে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে— তাহলে X-কে কে সৃষ্টি করেছে? যদি উত্তর দেওয়া হয় Y, তাহলে আবার প্রশ্ন আসবে— Y-এর সৃষ্টিকর্তা কে?

এভাবে প্রশ্নের পর প্রশ্ন চলতেই থাকবে, কিন্তু কোনো চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছানো যাবে না। একে দর্শনের ভাষায় বলা হয় Infinite Regress বা অসীম পশ্চাদগমন। যুক্তিবিদ্যায় এটি একটি অগ্রহণযোগ্য অবস্থা। তাই যুক্তিসঙ্গতভাবে একটি পর্যায়ে গিয়ে এমন একজন সত্তাকে মেনে নিতেই হয়, যিনি অসৃষ্ট (Uncaused) এবং অনাদি (Eternal)।

একসময় বিজ্ঞান কী ভাবতো?

গত শতাব্দীতেও বহু বিজ্ঞানী বিশ্বাস করতেন যে—

  • মহাবিশ্ব চিরন্তন
  • এর কোনো শুরু নেই
  • এর কোনো শেষও নেই

এই ধারণা অনুযায়ী তারা বলতেন, যেহেতু মহাবিশ্বের কোনো শুরু নেই, তাই এর জন্য আলাদা কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজনও নেই।

কিন্তু এই ধারণা টিকে থাকতে পারেনি। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে থার্মোডাইনামিক্সের সূত্র এই চিন্তাধারাকে পুরোপুরি ভেঙে দেয়।

থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র ও মহাবিশ্ব

থার্মোডাইনামিক্সের দ্বিতীয় সূত্র (Second Law of Thermodynamics) বলছে—

একটি বন্ধ সিস্টেমে (Closed System) সময়ের সাথে সাথে এন্ট্রপি (Entropy) বা বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি পায়।

সহজ ভাষায় এর অর্থ:

  • মহাবিশ্ব ক্রমাগত শক্তি হারাচ্ছে
  • উচ্চ শক্তি অবস্থা থেকে নিম্ন শক্তি অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে
  • এই প্রক্রিয়া উল্টো দিকে চালানো সম্ভব নয়

কফির কাপের উদাহরণ

একটি গরম কফির কাপ যদি টেবিলে রাখা হয়, তাহলে কী হয়?

  • সময়ের সাথে সাথে কফি ঠান্ডা হতে থাকে
  • কিন্তু কখনোই এমন হয় না যে ঠান্ডা কফি নিজে নিজে আরও গরম হয়ে যায়

এটাই থার্মোডাইনামিক্সের বাস্তব উদাহরণ।

যদি মহাবিশ্ব অনন্তকাল ধরে থাকতো, তাহলে এতদিনে এটি সম্পূর্ণ শক্তিহীন (Heat Death) হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমরা এখনো শক্তি, গতি ও কার্যকারণ দেখতে পাচ্ছি। সুতরাং যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হলো— মহাবিশ্ব অনন্ত নয়, এর একটি নির্দিষ্ট শুরু আছে।

বিগ ব্যাং থিওরি ও মহাবিশ্বের শুরু

মহাবিশ্বের উৎপত্তি ব্যাখ্যার জন্য এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও প্রমাণভিত্তিক তত্ত্ব হলো— বিগ ব্যাং থিওরি।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী:

  • সময়, স্থান ও পদার্থ একসময় অস্তিত্বে আসে
  • মহাবিশ্ব একটি নির্দিষ্ট সূচনাবিন্দু থেকে প্রসারিত হচ্ছে

অর্থাৎ, মহাবিশ্ব সৃষ্ট—চিরন্তন নয়।

যুক্তির সমীকরণে বিষয়টি বোঝা যাক

সমীকরণ–১

সব সৃষ্টির একটি নির্দিষ্ট শুরু ও শেষ আছে।

সমীকরণ–২

মহাবিশ্ব একটি সৃষ্টি।

ফলাফল

যেহেতু মহাবিশ্ব একটি সৃষ্টি, সেহেতু এরও একটি নির্দিষ্ট শুরু আছে—যা বিজ্ঞান দ্বারা সমর্থিত।

সমীকরণ–৩

স্রষ্টা সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

এখন লক্ষ্য করুন—

  • প্রথম সমীকরণ কেবল সৃষ্টি নিয়ে কথা বলে
  • কিন্তু স্রষ্টা নিজে সৃষ্টি নন, তিনি স্রষ্টা

অতএব, প্রথম সমীকরণ স্রষ্টার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। ফলে থার্মোডাইনামিক্সের সূত্রও এখানে খাটে না। এর অর্থ—

স্রষ্টার কোনো শুরু নেই, কোনো শেষ নেই।

অর্থাৎ, তাঁর জন্য নতুন করে কোনো সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন নেই। তিনি অনাদি ও অনন্ত।

Laws of Causality (কার্যকারণ নীতি) নিয়ে বিভ্রান্তি

অনেকেই বলেন— Laws of Causality অনুযায়ী সবকিছুরই একটি Cause বা কারণ থাকে। তাহলে স্রষ্টার কারণ কী?

আসল সত্য কী?

কার্যকারণ নীতির সঠিক সংজ্ঞা হলো:

Everything that has a beginning has a cause.

অর্থাৎ—

  • যার শুরু আছে, কেবল তারই Cause আছে
  • যার শুরু নেই, তার Cause থাকার প্রশ্নই আসে না

Time–Space–Matter এর সীমাবদ্ধতা

আইনস্টাইনের থিওরি অফ রিলেটিভিটি অনুযায়ী:

  • Time, Space ও Matter একে অপরের সাথে সংযুক্ত
  • এগুলো একসাথেই অস্তিত্বে এসেছে

সুতরাং, কার্যকারণ নীতি তখনই প্রযোজ্য যখন Time–Space–Matter বিদ্যমান।

যিনি এই Time–Space–Matter সৃষ্টি করেছেন, তাঁকে কি আবার এগুলোর ভেতরে বসিয়ে বিচার করা যায়?

এটা যুক্তিবিরুদ্ধ ও বিজ্ঞানবিরুদ্ধ।

বই ও মানুষের উদাহরণ

ধরুন একটি বই—

  • বই কাগজ ও কালি দিয়ে তৈরি

এখন প্রশ্ন:

  • আপনি কি কাগজ ও কালি দিয়ে তৈরি?

নিশ্চয়ই না। বইয়ের সংজ্ঞা দিয়ে মানুষকে ব্যাখ্যা করা যায় না।

ঠিক তেমনি—

  • মহাবিশ্ব যেহেতু Time–Space–Matter দিয়ে তৈরি
  • স্রষ্টা যেহেতু এগুলোর স্রষ্টা

তাই তাঁকে তাঁর সৃষ্ট জিনিস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না।

উপসংহার

স্রষ্টা হলেন এমন এক সত্তা—

  • যিনি সৃষ্টি নন
  • যাঁর কোনো শুরু নেই
  • যাঁর কোনো শেষ নেই
  • যিনি Time, Space, Matter ও Cause-এর ঊর্ধ্বে

অতএব,

“স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলো?”—এই প্রশ্নটি যুক্তিগতভাবে অবান্তর।

কারণ স্রষ্টা নিজেই সৃষ্টির সূচনা, তিনি অসৃষ্ট, অনাদি ও অনন্ত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2025 Logic TV — All Rights Reserved.