ডাঃ জাকির নায়েক আমার গুরু। তবে তার একটি কথার সাথে আমি একমত হতে পারিনি। তিনি জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বলেছেন এটি জায়েজ নয়। এর কারণ হিসেবে যেসব যুক্তি তিনি দিয়েছেন, সেগুলো আমার কাছে কিছুটা অযৌক্তিক লেগেছে।
১. প্রথমত তিনি কোরআনের আয়াত উল্লেখ করেছেন। সে আয়াতগুলো দ্বারা নাকি প্রমাণ হয় ইসলামে জন্মনিয়ন্ত্রণ হারাম।
২. দ্বিতীয়ত তিনি যে যুক্তি দিয়েছেন, তিনি তার পিতামাতার ৫ম সন্তান। যদি তার পিতামাতা জন্মনিয়ন্ত্রণ করতেন তাহলে তিনি পৃথিবীতে আসতে পারতেন না।
৩. তৃতীয়ত তিনি বেশি জনসংখ্যাকে আশীর্বাদ বলেছেন।
প্রথম যে যুক্তি তিনি দিয়েছেন, সেখানে বলেছেন কোরআনের আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয় আল্লাহ জন্মনিয়ন্ত্রণ করা নিষেধ করেছেন। চলুন আমরা আয়াত দুটো দেখে আসি।
সূরা আন‘আম ১৫১:
“আর দারিদ্র্যের ভয়ে নিজেদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। কেননা আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিজিক দিই।”
একই কথা সূরা ইসরার ৩১ নম্বর আয়াতে:
“দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করো না। আমিই তাদেরকে রিজিক দেই এবং তোমাদেরকেও।”
ডাঃ জাকির নায়েক এই দুই আয়াতের ভুল ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেছেন, তিনি একজন ডাক্তার, তিনি জানেন শুক্রাণু জীবিত এবং যেহেতু শুক্রাণু জীবিত, সেহেতু এটি নষ্ট করা মানে জীবন হত্যা করা।
এবার আপনি যদি সাহাবীদের দিকে তাকান, তাদের একাধিক স্ত্রী ছিল। এবং মহানবীরও একাধিক স্ত্রী ছিলেন। তিনি তাদের সঙ্গে পালা করে থাকতেন। কিন্তু তার সন্তানের সংখ্যা কয়জন?
আরবরা যেটা করতো, তা হলো চরম মুহূর্তে গিয়ে বীর্য বাইরে ফেলতো।
আর এখন অনেক পদ্ধতি চলে এসেছে — কনডম বা পিলস।
ডাঃ জাকির নায়েক জানেন শুক্রাণু জীবিত, কিন্তু তিনি একটা বিষয় স্কিপ করে গেছেন। সেটা হলো, একটি প্রাণ তৈরি হওয়ার জন্য ডিম্বাণুর প্রয়োজন। শুধুমাত্র শুক্রাণু একটি পরিপূর্ণ মানব প্রাণ নয়। এটি নষ্ট হলে মানুষ হত্যা হয় না। কোটি কোটি শুক্রাণু মানুষের দেহে তৈরি হয়, কিন্তু কোটি কোটি সন্তান তো সম্ভব নয়, তাই না?
আর কোরআনের আয়াত দুটোও ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কারণ এই আয়াত দুটো এই বিষয়ে বলা হয়নি। বলা হয়েছে অন্য বিষয় সম্পর্কে। তাফসিরে সুন্দরভাবে দেওয়া আছে — আরবের মানুষ দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তানদেরকে জীবন্ত কবর দিতো, বিশেষ করে কন্যা সন্তানদেরকে। আর এই কথাটাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে এই আয়াত দুটোর মাধ্যমে।
দ্বিতীয়ত, তিনি যুক্তি দিয়েছেন তিনি তার পিতামাতার পঞ্চম সন্তান। তার পিতামাতা যদি জন্মনিয়ন্ত্রণ করতেন, তাহলে তিনি পৃথিবীতে আসতেন না এবং মানুষের উপকার করতে পারতেন না। এখানে আমার দ্বিমত এই কারণে যে, আল্লাহ যদি সিদ্ধান্ত নেন আপনাকে পৃথিবীতে পাঠাবেন, তিনি যেকোনোভাবেই পাঠাতে পারেন। ধরুন, আপনার পিতামাতা দুইটি সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই দুইটি সন্তানের মধ্যেই আপনি হতেন একজন — যদি আল্লাহ চাইতেন আপনাকে পাঠাবেন। তার মানে এই যুক্তিটা টিকছে না। এবার ধরুন আপনি আপনার পিতামাতার পঞ্চম সন্তান। আপনার পিতামাতা সিদ্ধান্ত নিলেন আরও সন্তান নেবেন। ষষ্ঠ সন্তান হলো একজন চোর বা ডাকাত। তখন কিন্তু জন্মনিয়ন্ত্রণের কথাটা মনে পড়বে।
তৃতীয়ত, তিনি বেশি জনসংখ্যাকে আশীর্বাদ বলেছেন। ইউরোপ ও আমেরিকানরা বেশি জনসংখ্যা উৎসাহিত করেন। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশ নিরুৎসাহিত করে। ইউরোপ ও আমেরিকার মানুষেরা সভ্য, শিক্ষিত, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। কারণ তারা আইন জানে, নিয়ম-কানুন মানে, অন্যকে ক্ষতি করার চিন্তা করে না। তাদের ভূখণ্ডও বড়। কিন্তু বাংলাদেশের মতো একটি দেশে আমাদের ভূখণ্ড ছোট, কিন্তু তার তুলনায় জনসংখ্যা অনেক বেশি।
আর জনসংখ্যা বেশি মানে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বেশি থাকতে হবে। আমাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা বেশি নয়। আমাদের দেশের জনসংখ্যার বেশিরভাগ মানুষই অশিক্ষিত, বেশিরভাগ মানুষই আইন মেনে চলে না। আর এদের নিয়ন্ত্রণ করা সরকারের পক্ষে কঠিন। বেশি জনসংখ্যার কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। মানুষকে বাধ্য হয়ে প্রবাসে থাকতে হচ্ছে। বেশিরভাগ মানুষ অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে রয়েছেন ইত্যাদি নানা কারণে জনসংখ্যা কম মানে সেই দেশে শান্তি বেশি।
তাহলে বেশি জনসংখ্যা কি আশীর্বাদ বলা মোটেই যৌক্তিক কিনা কমেন্টে জানাবেন।
ডাঃ জাকির নায়েকের এই কথাগুলোর সাথে আমি একমত হইনি। তবে তিনি একটি কথা বলেছেন — স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ হারাম। এতে আমি সম্পূর্ণ একমত। একজন নারীর শরীরে এমন কোনো ঔষধ ব্যবহার করা, বা প্রজননের অঙ্গ কেটে ফেলা — এ ধরনের কাজ ইসলামের শরিয়াসম্মত নয়।





