কুরআনে এমন অসংখ্য বিষয় উল্লেখ আছে, যেগুলো মানুষের কাছে অনেক পরে বিজ্ঞানের উন্নতির মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে। সমুদ্রবিজ্ঞান বা মেরিন সায়েন্স তার অন্যতম। মিষ্ট ও নোনা পানির বিভাজন, সমুদ্রের গভীর অন্ধকার এবং পানির স্তরবিন্যাস—এসবই আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার। কিন্তু কুরআন এগুলো বলেছে প্রায় ১৪০০ বছর আগে।

মিষ্ট ও নোনা পানির মাঝে রয়েছে অদৃশ্য বিভাজন
কুরআনে বলা হয়েছে—
“দুটি সমুদ্রকে তিনি প্রবাহিত করেছেন যেন তারা পরস্পরে মিলিত হয়। তা সত্ত্বেও উভয়ের মাঝখানে রয়েছে এক প্রাচীর, যা সে দু’টি অতিক্রম বা লঙ্ঘন করে না।”
(সূরা আর-রহমান: ১৯-২০)
এখানে ‘বারযাখ’ শব্দের অর্থ হলো—অদৃশ্য প্রাচীর বা বিভাজন রেখা। বিজ্ঞানও বলে, দু’সমুদ্র মিলিত হলেও তাদের লবণাক্ততা, তাপমাত্রা, ঘনত্বের পার্থক্য মিশ্রণকে বাধা দেয়।
আরবি শব্দ ‘মারাজা’ অর্থ—“তারা মিলিত হয়, তবুও সম্পূর্ণভাবে মিশে যায় না”।
এই দুই বিপরীতধর্মী ব্যাখ্যা আধুনিক বিজ্ঞান ব্যতীত পূর্বের মুফাসসিররা বুঝতে পারেননি।
আজ সমুদ্রবিজ্ঞানীরা নিশ্চিত—
দুটি সমুদ্রের মাঝে রয়েছে এক ধীর গতির তির্যক পানিপ্রাচীর, যার মধ্য দিয়ে পানি ধীরে ধীরে প্রবেশ করলেও তার বৈশিষ্ট্য পরিবর্তন হয়ে যায়। ফলে প্রতিটি সমুদ্র তার স্বতন্ত্রতা বজায় রাখে।
কোরআনের আরও প্রমাণ
“এবং পানির দু’টি ধারার মাঝখানে তিনি এক বিভাজন প্রাচীর গঠন করেছেন।”
(সূরা নামল: ৬১)
এ প্রাচীর কোনো দৃশ্যমান দেয়াল নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে একটি ডেনসিটি ব্যারিয়ার, যা আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরের মাঝে জিব্রালটার প্রণালীসহ বহু স্থানে দেখা যায়।

মিষ্ট পানি ও নোনা পানির মাঝে বিশেষ বাধা
কুরআনে বলা হয়েছে—
“তিনি আল্লাহ যিনি দু’সমুদ্রকে যুক্তভাবে প্রবাহিত করেছেন; একটি হল মিষ্ট সুস্বাদু, আর অপরটি হল লবণাক্ত বিস্বাদ এবং উভয়ের মাঝে তিনি এক প্রাচীর ও এক দুর্ভেদ্য বিভাজক নির্মাণ করেছেন।”
(সূরা ফুরক্বান: ৫৩)
এখানে মোহনা অঞ্চলের জন্য বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে—
এটি হলো পিকনোক্লাইন জোন, যেখানে পানি স্তরগুলো আলাদা থাকে। বিজ্ঞান বলে, মিষ্ট পানি ও লবণাক্ত পানির মাঝখানের এই সীমানা স্তরের লবণাক্ততা উভয়ের চেয়ে ভিন্ন।
নীলনদের ভূমধ্যসাগরে মিশে যাওয়ার স্থানসহ অনেক এলাকাতে এ ঘটনা দেখা যায়।

সমুদ্রের গভীর তলদেশ অন্ধকারময় — বিজ্ঞান যা পরে আবিষ্কার করল
কোরআনের আয়াত—
“(অবিশ্বাসীর দৃষ্টান্ত) গভীর সমুদ্রের বুকে ঘন কালো অন্ধকারমালা, যাকে তরঙ্গের মেঘমালা ছেয়ে রেখেছে; একের পর এক অন্ধকার স্তর… সে নিজের হাত বের করলে তা প্রায় দেখতে পায় না।”
(সূরা নূর: ৪০)
জেদ্দার কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত সামুদ্রিক ভূতত্ত্ববিদ দুর্গা রাও বলেন—
“আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া গভীর সমুদ্রের অন্ধকার সম্পর্কে জানা মানুষের পক্ষে অসম্ভব ছিল।”
কেন অন্ধকার হয়?
১. আলোর রং একে একে শোষিত হয়
- ১০–১৫ মিটার → লাল রং হারায়
- ৩০–৫০ মিটার → কমলা
- ৫০–১০০ মিটার → হলুদ
- ১০০–২০০ মিটার → সবুজ
- ২০০ মিটার+ → নীল, বেগুনি
ফলে ধীরে ধীরে একের পর এক অন্ধকার স্তর তৈরি হয়।
২. মেঘের নিচে প্রথম অন্ধকার স্তর
মেঘ আলো শোষে → উপরে অন্ধকার তৈরি হয়।
এরপর সমুদ্রের তরঙ্গ আবার আলো প্রতিফলিত করে → নিচে আরেক অন্ধকার স্তর হয়।
৩. সমুদ্রের অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ
সমুদ্রের ভেতরে বিশাল আন্ডারওয়াটার ওয়েভ বা অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ রয়েছে, যা গভীর অন্ধকার সৃষ্টি করে—
কোরআনে যেমন বলা হয়েছে,
“তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ”।
১,০০০ মিটার নিচে পুরোপুরি অন্ধকার, যেখানে মাছরা নিজেদের আলো (বায়োলুমিনিসেন্স) ছাড়া একে অপরকে দেখতে পারে না।
দুর্গা রাও বলেন—
“১৪০০ বছর আগে একজন নিরক্ষর মানুষের পক্ষে এ তথ্য জানা অসম্ভব। এটি অবশ্যই অতিপ্রাকৃতিক উৎস থেকে এসেছে।”
উপসংহার
কোরআন সমুদ্রবিজ্ঞানের যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছে—
- মিষ্ট ও নোনা পানির বিভাজন
- বারযাখ বা অদৃশ্য প্রাচীর
- পিকনোক্লাইন অঞ্চল
- গভীর সমুদ্রের স্তরভিত্তিক অন্ধকার
- অভ্যন্তরীণ তরঙ্গ
এসবই আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
মানবজাতি যখন পৃথিবীর গভীরতম সমুদ্রেও প্রযুক্তি নিয়ে প্রবেশ করতে পারেনি, তখন কোরআন সেই সত্যগুলো প্রকাশ করেছে—এটাই তার ঐশ্বরিকত্বের প্রমাণ।





