ইসলামে দু’জন নারীর সাক্ষ্য কেন একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান বলা হয়েছে?

ইসলামকে অনেক সময় নারী-পুরুষ বৈষম্যের ধর্ম বলে অভিযোগ করা হয়। বিশেষ করে দুটি বিষয় বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ে—

  1. দু’জন নারীর সাক্ষ্য কেন একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান বলা হয়েছে?
  2. উত্তরাধিকারসূত্রে নারীর অংশ কেন অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের অর্ধেক?

এই লেখায় কুরআন, হাদীস ও যুক্তির আলোকে বিষয় দুটি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হলো।

প্রথম অংশ: সাক্ষ্যের ব্যাপারে নারী–পুরুষের সমতা

প্রশ্ন: দু’জন নারীর সাক্ষ্য কেন একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান?

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা দরকার—

👉 সব ক্ষেত্রে দু’জন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান—এই ধারণা সঠিক নয়।
এটি শুধু নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, বিশেষ করে সম্পত্তি ও ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে।

কুরআনে সাক্ষ্য সম্পর্কে পাঁচটির বেশি আয়াত আছে, যার অধিকাংশেই নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি।

১. সম্পত্তি ও ঋণ লেনদেনের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য

(সূরা বাকারা: ২৮২)

কুরআনে একমাত্র একটি আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—

“যদি দু’জন পুরুষ সাক্ষী না পাওয়া যায়, তবে একজন পুরুষ ও দু’জন নারী সাক্ষী থাকবে—যাতে একজন ভুল করলে অন্যজন স্মরণ করিয়ে দিতে পারে।”
(সূরা বাকারা: ২৮২)

আয়াতের প্রেক্ষাপট

এই আয়াতটি এসেছে ঋণ ও সম্পত্তির লিখিত চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে। এটি কোনো সাধারণ সাক্ষ্য নয়; বরং—

  • দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক লেনদেন
  • হিসাব-নিকাশ
  • দলিল ও প্রমাণ সংরক্ষণ

সংক্রান্ত নির্দেশনা।

যুক্তিগত ব্যাখ্যা

ইসলামে—

  • পারিবারিক ও আর্থিক দায়িত্ব প্রধানত পুরুষের উপর ন্যস্ত
  • সম্পত্তি ও বাণিজ্যে পুরুষ সাধারণত বেশি সম্পৃক্ত
  • সে যুগের সামাজিক বাস্তবতায় নারীরা এ ক্ষেত্রে কম জড়িত ছিলেন

এজন্য কুরআন এখানে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা হিসেবে দু’জন নারীর কথা বলেছে, নারীর মর্যাদা কমানোর জন্য নয়।

🔹 যেমন—একটি জটিল অস্ত্রোপচারে দুইজন সার্জন দরকার হয়। না পেলে একজন সার্জন ও দু’জন সাধারণ চিকিৎসক নেওয়া হয়। এতে সাধারণ চিকিৎসকের মান কমে যায় না।

২. হত্যাকাণ্ড ও ফৌজদারি মামলায় সাক্ষ্য

কিছু ফকীহের মতে—

  • হত্যা বা ভয়াবহ অপরাধে নারী স্বভাবতই বেশি মানসিক চাপ ও ভয় অনুভব করতে পারেন
  • উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিভ্রান্তি আসতে পারে

এই কারণে কিছু ফিকহি মতামতে বলা হয়েছে—

হত্যাকাণ্ডে দু’জন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সমান

তবে মনে রাখতে হবে—

👉 এটি সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নয়, বরং নির্দিষ্ট ফিকহি ব্যাখ্যা।

৩. অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী–পুরুষের সাক্ষ্য সমান

কুরআনের বহু আয়াতে সাক্ষ্যের ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদ করা হয়নি।

(ক) ওসিয়তের সাক্ষ্য

“ওসিয়তের সময় তোমাদের মধ্য থেকে দু’জন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখো।”
(সূরা মায়েদাহ: ১০৬)

(খ) তালাকের সাক্ষ্য

“তোমাদের মধ্য থেকে দু’জন নির্ভরযোগ্য লোককে সাক্ষী রাখবে।”
(সূরা তালাক: ২)

(গ) অপবাদের ক্ষেত্রে সাক্ষ্য

“চারজন সাক্ষী আনতে না পারলে তাদের শাস্তি হবে।”
(সূরা নূর: ৪)

➡️ এখানে কোথাও বলা হয়নি সাক্ষী পুরুষই হতে হবে—শুধু ন্যায়পরায়ণ হওয়াই শর্ত।

৪. কুরআন নিজেই একজন নারীর সাক্ষ্যকে পুরুষের সমান করেছে

(লিআন প্রসঙ্গ)

সূরা নূর (৬-৯) আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অভিযোগের ক্ষেত্রে—

  • স্বামীর চারবার শপথ
  • স্ত্রীর চারবার শপথ

➡️ এখানে একজন নারীর সাক্ষ্য একজন পুরুষের সাক্ষ্যের সমান ধরা হয়েছে।

৫. হাদীস গ্রহণে একজন নারীর সাক্ষ্যই যথেষ্ট

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা.) একাই প্রায় ২,১২০টির বেশি হাদীস বর্ণনা করেছেন, যা পুরো উম্মাহ গ্রহণ করেছে।

👉 যদি নারীর সাক্ষ্য অর্ধেক হতো, তাহলে ইসলামের অর্ধেক জ্ঞানই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যেত।

৬. কিছু ক্ষেত্রে নারীর সাক্ষ্যই গ্রহণযোগ্য

  • প্রসব
  • স্তন্যদান
  • নারীর গোপন শারীরিক বিষয়

এক্ষেত্রে পুরুষের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়, বরং নারীর সাক্ষ্যই প্রাধান্য পায়।

দ্বিতীয় অংশ: উত্তরাধিকার বিষয়ে নারী–পুরুষের সমতা

প্রশ্ন: ইসলামে নারীর অংশ কেন অনেক ক্ষেত্রে পুরুষের অর্ধেক?

কুরআনে উত্তরাধিকার আইন অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে— সূরা নিসা: ৭-১২, ১৭৬

১. মৌলিক নীতি

“একজন পুত্রের অংশ দুই কন্যার সমান।”
(সূরা নিসা: ১১)

এটি সাধারণ নিয়ম, সব ক্ষেত্রে নয়।

২. বহু ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমান বা বেশি পায়

  • মা কখনো বাবার চেয়ে বেশি পান
  • বোন কখনো ভাইয়ের সমান পান
  • স্ত্রী কখনো স্বামীর তুলনায় নিরাপদ অংশ পান

অর্থাৎ— 👉 নারী সবসময় অর্ধেক পায়—এ ধারণা ভুল।

৩. কেন পুরুষের অংশ বেশি?

কারণ—

  • পুরুষের উপর ভরণ-পোষণের পূর্ণ দায়িত্ব
  • স্ত্রী, সন্তান, এমনকি অভাবী আত্মীয়ের খরচও তার দায়িত্ব
  • নারীর নিজের আয় বা সম্পদ খরচ করার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই

বাস্তব উদাহরণ

একটি পরিবারে—

  • ছেলে পেল ১,০০,০০০ টাকা → সংসারে খরচ করতেই হবে
  • মেয়ে পেল ৫০,০০০ টাকা → নিজের সম্পূর্ণ মালিকানা

➡️ বাস্তবে কে বেশি সুবিধায়?

৪. গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়—শেষ পর্যন্ত উভয়েই সমান পায়

পুত্র → পিতার সম্পদ + স্ত্রীর ভরণ-পোষণ
কন্যা → পিতার সম্পদ + স্বামীর সম্পদ

➡️ শেষ হিসাব করলে নারী-পুরুষ উভয়ই প্রায় সমান সুবিধা পায়।

উপসংহার

🔹 ইসলাম নারী-পুরুষকে দায়িত্বের ভিত্তিতে বিচার করেছে, মর্যাদার ভিত্তিতে নয়
🔹 সাক্ষ্য ও উত্তরাধিকার—উভয় ক্ষেত্রেই ইসলামের বিধান ন্যায়ভিত্তিক ও বাস্তবসম্মত
🔹 বৈষম্য নয়, বরং সামাজিক ভারসাম্য রক্ষা করাই ইসলামের উদ্দেশ্য

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2025 Logic TV — All Rights Reserved.