ভূমিকা
মৃত্যুর পর আবার জীবিত করা হবে—এই বিশ্বাসকে অনেকেই অন্ধ বিশ্বাস বলে মনে করেন। বিশেষ করে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে বসবাসকারী মানুষ প্রশ্ন তোলে: “যে দেহ মাটিতে মিশে গেছে, তাকে আবার কীভাবে জীবিত করা সম্ভব?”
এই প্রশ্ন অযৌক্তিক নয়। বরং এটি মানুষের চিন্তাশীল মননেরই প্রতিফলন। কিন্তু ইসলামের পরকাল-ধারণা কোনো আবেগনির্ভর কল্পনা নয়; এটি যুক্তি, ন্যায়বিচার এবং বাস্তবতার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি বিশ্বাস।
১. মৃত্যুর পর জীবন—অন্ধ বিশ্বাস নয়
মানুষ সাধারণত যা চোখে দেখে না, যা পরীক্ষাগারে প্রমাণ করা যায় না—তাকে সহজেই অস্বীকার করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, এমন বহু সত্য রয়েছে যা মানুষের জ্ঞান সীমাবদ্ধ থাকার কারণে দীর্ঘ সময় অজানা ছিল।
পরকাল সম্পর্কেও বিষয়টি একই। মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে কোনো কিছুকে অস্বীকার করা বুদ্ধিবৃত্তিক সততা নয়।
২. পরকাল একটি যুক্তিপূর্ণ বিশ্বাস
কোরআন মাজীদে প্রায় এক হাজারেরও বেশি আয়াত রয়েছে যেগুলো প্রকৃতি, সৃষ্টি ও বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত। আধুনিক বিজ্ঞান ইতোমধ্যে কোরআনের বহু তথ্যের সত্যতা আবিষ্কার করেছে।
- কোরআনের বর্ণনার প্রায় ৮০% তথ্য বিজ্ঞান সমর্থন করেছে
- অবশিষ্ট ২০% বিষয়ে বিজ্ঞান এখনও নীরব, ভুল প্রমাণ করেনি
যেখানে বিজ্ঞান নিশ্চিতভাবে কোনো কিছুকে অস্বীকার করতে পারেনি, সেখানে যুক্তি অনুযায়ী তা মিথ্যা বলা যায় না। সুতরাং পরকাল, পুনরুত্থান ও হিসাবের ধারণা—এই অজানা অংশের অন্তর্ভুক্ত হলেও তা অযৌক্তিক নয়।
৩. পরকাল অস্বীকার করলে নৈতিকতার ভিত্তি ভেঙে পড়ে
ধরা যাক, এক ব্যক্তি অত্যন্ত ক্ষমতাবান, প্রভাবশালী ও ধনী। তার বিরুদ্ধে কোনো আইন কাজ করে না। সে ছিনতাই, রাহাজানি, ব্যভিচার কিংবা অন্যায়ের মাধ্যমে বিলাসী জীবন যাপন করে।
এখন প্রশ্ন হলো—
👉 তার কাছে কোন যুক্তিতে প্রমাণ করা যাবে যে এসব কাজ অন্যায়?
সাধারণত যেসব যুক্তি দেওয়া হয়—
(ক) ভুক্তভোগীর কষ্ট
অত্যাচারী বলবে: “ও কষ্ট পাচ্ছে—এটা তার সমস্যা, আমার লাভ হচ্ছে।”
(খ) একদিন তাকেও কেউ লুণ্ঠন করবে
সে বলবে: “আমাকে কেউ ছুঁতে পারবে না, আমার ক্ষমতা আছে।”
(গ) পুলিশ বা রাষ্ট্র শাস্তি দেবে
সে বলবে: “পুলিশ, প্রশাসন সবাই আমার পকেটে।”
(ঘ) সহজ উপায়ে অর্থ উপার্জন
সে যুক্তি দেবে: “সহজ পথে লাভ হলে কষ্ট কেন করব?”
(ঙ) মানবতা ও নৈতিকতা
সে বলবে: “মানবতা মানি না—লাভই আমার নীতি।”
এই অবস্থায় দেখা যায়, পরকাল অস্বীকারকারী শক্তিশালীর কাছে নৈতিকতার কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না।
৪. মানবীয় আইন চূড়ান্ত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অক্ষম
মানুষের তৈরি আইন সীমাবদ্ধ। অনেক সময় অপরাধী ধরা পড়ে, আবার অনেক সময় ইতিহাসের ভয়ংকর অপরাধীরাও পার পেয়ে যায়।
এতে প্রশ্ন জাগে—
👉 চূড়ান্ত ন্যায়বিচার কোথায় হবে?
৫. প্রত্যেক মানুষ নিজের জন্য সুবিচার চায়
যে ব্যক্তি নিজে অবিচার করে, সেও নিজের ওপর অবিচার হলে প্রতিবাদ করে। এটি মানুষের সহজাত বৈশিষ্ট্য।
এই সুবিচারের আকাঙ্ক্ষাই প্রমাণ করে—
👉 একটি চূড়ান্ত বিচারের স্থান থাকা আবশ্যক।
৬. আল্লাহ সর্বশক্তিমান ও পরম ন্যায়বিচারক
ইসলাম ঘোষণা করে—আল্লাহ এমন সত্তা যিনি ক্ষমতায় সবার ঊর্ধ্বে এবং ন্যায়বিচারে নিখুঁত।
“নিশ্চয়ই আল্লাহ বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না।”
(সূরা নিসা: ৪০)
যেখানে মানুষের আইন ব্যর্থ, সেখানে আল্লাহর বিচার চূড়ান্ত।
৭. এই জীবন একটি পরীক্ষা
কোরআন স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয়—
“তিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন তোমাদের পরীক্ষা করার জন্য—কে আমলে উত্তম।”
(সূরা মুলক: ২)
এই দুনিয়ায় সব অপরাধের বিচার হয় না। কিন্তু পরকালে সব কিছুর পূর্ণ হিসাব হবে।
৮. ইতিহাসের বড় অপরাধীরা ও পরকাল
হিটলার তার শাসনামলে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষ হত্যা করেছে। মানুষের আইনে তার অপরাধের যথাযথ প্রতিদান দেওয়া অসম্ভব।
কিন্তু আল্লাহ ঘোষণা করেছেন—
“তাদের চামড়া পুড়ে গেলে আমি নতুন চামড়া দেব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করতে থাকে।”
(সূরা নিসা: ৫৬)
এটি চূড়ান্ত ন্যায়বিচারের ঘোষণা।
৯. পরকাল ছাড়া পাপ-পুণ্য ও মানুষের মর্যাদা অর্থহীন
যদি পরকাল না থাকে—
- পাপ ও পুণ্যের পার্থক্য থাকে না
- অত্যাচার ও ন্যায়ের মধ্যে চূড়ান্ত ফারাক থাকে না
- মানুষের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়
সুতরাং পরকাল শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নয়, বরং নৈতিকতা ও মানবতার ভিত্তি।
উপসংহার
মৃত্যুর পর পুনরুত্থান কোনো অন্ধ বিশ্বাস নয়। এটি যুক্তি, ন্যায়বিচার, মানব-মনস্তত্ত্ব এবং বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সত্য।
পরকাল ছাড়া পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অন্যায়গুলোর কোনো ন্যায়সঙ্গত পরিণতি সম্ভব নয়।





