মুসলমানরা কেন বিভিন্ন মতবাদে বিভক্ত?

ভূমিকা

আজকের মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় ও বেদনাদায়ক বাস্তবতা হলো বিভক্তি। একই কোরআন, একই নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), একই কিবলা—তবুও আমরা বিভিন্ন দল, উপদল ও মতবাদে বিভক্ত।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠে—

যখন সব মুসলমান একই কোরআনের আনুগত্য করে, তাহলে কেন তাদের মধ্যে এত মতভেদ ও বিভাজন?

১. ইসলাম মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে নির্দেশ দিয়েছে

এটি একটি স্বীকৃত সত্য যে, মুসলমান আজ বিভিন্ন দলে বিভক্ত। কিন্তু ইসলাম কখনোই এই বিভক্তিকে সমর্থন করে না। বরং ইসলাম চায়—মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ থাকুক।

কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—

অর্থ:
“তোমরা সকলে আল্লাহর রজ্জু শক্ত করে ধরো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।”
(সূরা আল ইমরান: ১০৩)

আল্লাহর রজ্জু বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

মুফাসসিরদের মতে, ‘আল্লাহর রজ্জু’ বলতে বোঝানো হয়েছে—
👉 আল্লাহর কিতাব (কোরআন) ও রাসূলুল্লাহ (ছ:) এর সুন্নাহ।

অর্থাৎ মুসলমানদের ঐক্যের মূল ভিত্তি হলো কোরআন ও সুন্নাহ। এই ভিত্তি আঁকড়ে ধরলে বিভক্তির সুযোগ থাকে না।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন—

অর্থ:
“হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।”
(সূরা নিসা: ৫৯)

এ থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়—একজন মুসলমানের জন্য কোরআন ও হাদীসকেই আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা ফরয।

আল কুরআন

২. ইসলামে দলাদলি ও বিভক্তি স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ

ইসলাম শুধু ঐক্যের নির্দেশই দেয়নি, বরং দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করাকেও কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে।

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেন—

অর্থ:
“নিশ্চয়ই যারা তাদের দ্বীনকে টুকরো টুকরো করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে—আপনার সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের বিষয় আল্লাহর কাছেই ন্যস্ত, তিনি তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অবহিত করবেন।”
(সূরা আন‘আম: ১৫৯)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়—
👉 দলাদলি ও বিভক্তি ইসলামের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ।

কিন্তু বাস্তবতা হলো—
আজ অনেক মুসলমান পরিচয় দেয় এভাবে:

  • আমি সুন্নী
  • আমি শিয়া
  • আমি হানাফী / শাফেয়ী
  • আমি দেওবন্দী / বেরেলবী

প্রশ্ন হলো—এগুলো কি কোরআনের দেওয়া পরিচয়?

৩. নবী করীম (ছ:) কোন মতবাদের অনুসারী ছিলেন?

যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়—

নবী মুহাম্মদ (ছ:) কি হানাফী ছিলেন? না শাফেয়ী? না মালেকী?

উত্তর হবে—না।

👉 নবী করীম (ছ:) ছিলেন একজন মুসলমান

শুধু রাসূলুল্লাহ (ছ:) নন, বরং সকল নবীই মুসলমান ছিলেন।

কোরআনে বলা হয়েছে—

  • হযরত ঈসা (আ:) নিজেকে মুসলমান বলেছেন (সূরা আল ইমরান: ৫২)
  • হযরত ইব্রাহীম (আ:) কে মুসলমান বলা হয়েছে (সূরা আল ইমরান: ৬৭)

অতএব, নবীদের পথ হলো—মুসলমান হিসেবে পরিচিত হওয়া, অন্য কোনো দলীয় নামে নয়।

৪. কোরআনের নির্দেশ: “আমি একজন মুসলমান”

(ক) পরিচয়ের ক্ষেত্রে কোরআনের শিক্ষা

কোরআনুল কারীমে আল্লাহ তায়ালা বলেন—

অর্থ:
“তার চেয়ে উত্তম কথা আর কার হতে পারে যে আল্লাহর দিকে ডাকে, সৎকাজ করে এবং বলে—নিশ্চয়ই আমি একজন মুসলমান।”
(সূরা হা-মীম সাজদা: ৩৩)

এখানে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন—
👉 পরিচয় হবে: “আমি একজন মুসলমান”।

(খ) নবী করীম (ছ:) এর দাওয়াতি চিঠি

রাসূলুল্লাহ (ছ:) পারস্যের বাদশাহকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে যে চিঠি পাঠিয়েছিলেন, তাতে সূরা আল ইমরানের এই আয়াত উল্লেখ ছিল—

অর্থ:
“যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে বলো—তোমরা সাক্ষী থাকো, আমরা তো মুসলমান।”

এখানেও কোনো দলীয় পরিচয় নেই—শুধু মুসলমান।

উপসংহার

মুসলমানদের বিভক্তির মূল কারণ হলো—

  • কোরআন বুঝে না পড়া
  • হাদীসের সঠিক অনুশীলন না করা
  • দলীয় গোঁড়ামি
  • অন্ধ অনুসরণ

যদি মুসলমানরা আবার ফিরে আসে— ✔ কোরআনের দিকে
✔ সহীহ সুন্নাহর দিকে

তাহলে ইনশাআল্লাহ উম্মাহর ঐক্য ফিরে আসবে।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে শুধু “মুসলমান” হিসেবে জীবন যাপন করার তাওফিক দিন। আমীন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2025 Logic TV — All Rights Reserved.