ইসলাম সর্বোত্তম হলে মুসলমানরা কেন অনৈতিক কাজে জড়ায়?

ভূমিকা

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা—এ দাবি মুসলমানদের কাছে নতুন কিছু নয়। কিন্তু বাস্তব জীবনে আমরা প্রায়ই দেখি, অনেক মুসলমান ইসলামের আদর্শ অনুযায়ী জীবনযাপন করছে না। বরং কিছু মুসলমানের আচরণে অবিশ্বাস, অনির্ভরযোগ্যতা, ধোঁকাবাজি, ঘুষ, চোরাচালানসহ নানা অসামাজিক কর্মকাণ্ড লক্ষ্য করা যায়।
এই বাস্তবতা অনেকের মনে একটি প্রশ্ন তোলে—

যদি ইসলাম সর্বোত্তম ধর্ম হয়, তাহলে মুসলমানদের মধ্যে এসব অনৈতিক কাজ এত বেশি কেন দেখা যায়?

এই লেখায় আমরা আবেগ নয়, যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করব।

১. প্রচার মাধ্যম ও ইসলাম: একটি পক্ষপাতদুষ্ট উপস্থাপন

(ক) বৈশ্বিক মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ ও ইসলামভীতি

আধুনিক যুগে মানুষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে প্রচার মাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত শক্তিশালী। বাস্তবতা হলো—বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠান মূলত পশ্চিমা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রণে। এসব মাধ্যম বহু বছর ধরেই ইসলামকে একটি “ভীতিকর” ধর্ম হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে।

ইসলামের শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবকল্যাণমূলক দিকগুলো উপেক্ষিত থাকে, আর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার মাধ্যমে পুরো মুসলিম সমাজকে দায়ী করা হয়।

(খ) অপরাধের দায় মুসলমানদের ওপর চাপানোর প্রবণতা

কোনো বিস্ফোরণ বা সন্ত্রাসী ঘটনার পর প্রায়ই দেখা যায়, তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগেই মুসলমানদের দায়ী করা হয়। শিরোনামে বড় অক্ষরে “ইসলামি সন্ত্রাস” শব্দ ব্যবহার করা হয়।
কিন্তু পরে যদি প্রমাণিত হয় যে ঘটনাটি কোনো অমুসলিম দ্বারা সংঘটিত, তখন সেটি গুরুত্বহীন সংবাদ হিসেবে চাপা পড়ে যায়।

এই দ্বিমুখী আচরণ মানুষের মনে ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করে।

(গ) অপরাধের সংবাদে বৈষম্য

সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। কোনো মুসলমানের ব্যক্তিগত জীবনসংক্রান্ত বিষয়কে বড় করে উপস্থাপন করা হয়, অথচ অমুসলিম সমাজে সংঘটিত ভয়াবহ অপরাধ অনেক সময় সংক্ষিপ্ত বা গুরুত্বহীনভাবে প্রকাশিত হয়।

এতে বাস্তব চিত্র নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট বর্ণনা (Narrative) মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া হয়।

২. প্রত্যেক সমাজেই “কালো ভেড়া” থাকে

কোনো সমাজই শতভাগ নিষ্পাপ মানুষের সমষ্টি নয়। মুসলমান সমাজও এর ব্যতিক্রম নয়।

হ্যাঁ, কিছু মুসলমান—

  • মিথ্যা বলে
  • ঘুষ গ্রহণ করে
  • বিশ্বাসভঙ্গ করে
  • প্রকাশ্যে ইসলামের নিষিদ্ধ কাজ করে

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এগুলো কি শুধু মুসলমানদের মধ্যেই আছে?

বাস্তবতা হলো, প্রতিটি ধর্ম ও জাতির মধ্যেই ভালো ও মন্দ মানুষ রয়েছে। অথচ মুসলমানদের ক্ষেত্রে কিছু ব্যক্তির অপরাধকে পুরো উম্মাহর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়—যা যুক্তিসংগত নয়।

৩. সমষ্টিগতভাবে মুসলমানরা কি নৈতিক দিক থেকে নিকৃষ্ট?

সব “কালো ভেড়া” সত্ত্বেও মুসলমানদের একটি সামগ্রিক পরিচয় রয়েছে।

  • মুসলমানরাই একমাত্র বড় জনগোষ্ঠী যারা মদ ও ব্যভিচারকে ধর্মীয়ভাবে নিষিদ্ধ মনে করে
  • বিশ্বজুড়ে দান-সদকা ও যাকাতের ক্ষেত্রে মুসলমানরা অগ্রগামী
  • পরিবার, লজ্জাবোধ, পর্দা ও নৈতিকতার ধারণা এখনো মুসলিম সমাজেই সবচেয়ে বেশি বিদ্যমান

ইসলাম শুধু ব্যক্তি নয়, সমাজকেও শুদ্ধ করতে চায়। মুসলমানরা সেই আদর্শ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলেও, নৈতিক মানদণ্ডটি এখনো ইসলামই নির্ধারণ করে দেয়—এটাই বড় পার্থক্য।

৪. গাড়ির গুণমান চালক দিয়ে বিচার করা যায় না

ধরা যাক, একটি উন্নতমানের মার্সিডিজ গাড়ি আছে। কিন্তু সেটি চালাচ্ছে এমন একজন ব্যক্তি, যিনি চালনাই জানেন না। দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা কি গাড়িকে দোষ দেব, না চালককে?

ঠিক তেমনি—

  • ইসলাম হলো একটি নিখুঁত ব্যবস্থা
  • মুসলমান হলো সেই ব্যবস্থার চালক

চালক ভুল করলে ব্যবস্থাকে দায়ী করা যুক্তিহীন। ইসলামের মান জানতে হলে মুসলমানদের নয়, ইসলামের মূল উৎস—কুরআন ও সুন্নাহ দেখতে হবে।

৫. ইসলাম বুঝতে চাইলে মুহাম্মাদ (সা.)-কে দেখুন

ইসলামের বাস্তব রূপ জানতে চাইলে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উদাহরণ হলেন—

আল্লাহর শেষ নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)

তিনি ছিলেন—

  • সর্বোচ্চ নৈতিকতার অধিকারী
  • পরম বিশ্বস্ত (আল-আমিন)
  • ন্যায়বিচারের আদর্শ

শুধু মুসলমান নয়, বহু নিরপেক্ষ অমুসলিম ঐতিহাসিকও তাঁকে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হিসেবে স্বীকার করেছেন।

অমুসলিম ঐতিহাসিকদের স্বীকৃতি

  • Michael H. Hart তার বিখ্যাত গ্রন্থ The 100-এ মুহাম্মাদ (সা.)-কে ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্থান দিয়েছেন
  • Thomas Carlyle তাঁকে একজন সত্যনিষ্ঠ সংস্কারক হিসেবে উল্লেখ করেছেন
  • Lamartine তাঁকে নৈতিকতার সর্বোচ্চ মানদণ্ড হিসেবে বর্ণনা করেছেন

এগুলো প্রমাণ করে—ইসলামের সমস্যা আদর্শে নয়, বরং অনুসরণে।

উপসংহার

ইসলাম ও মুসলমান এক নয়।
ইসলাম একটি পরিপূর্ণ ও সর্বোত্তম জীবনব্যবস্থা।
মুসলমান সেই ব্যবস্থার অনুসারী—যারা অনেক সময় ব্যর্থ হয়।

অতএব, ইসলামকে বিচার করতে হলে মুসলমানদের নয়, ইসলামের শিক্ষা, কুরআন, সুন্নাহ ও নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবন অধ্যয়ন করতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2025 Logic TV — All Rights Reserved.