তাদের অন্তরে আল্লাহ মোহন মেরে দেন, সত্যিই কি তাই?

ভূমিকা

কুরআনের সূরা আল-বাকারা, মুসলিম ও অমুসলিম—উভয় মহলেই বহুল আলোচিত একটি সূরা। বিশেষ করে ৬–৭ নম্বর আয়াতকে কেন্দ্র করে একটি আপত্তি বা অভিযোগ প্রায়ই উত্থাপিত হয়। প্রশ্নটি মূলত এমন: আল্লাহ যদি কাফিরদের অন্তর ও কানে মোহর মেরে দেন, তবে তারা সত্য বুঝবে কীভাবে? আর সত্য বুঝতে না পারলে তাদের শাস্তি দেওয়া কি ন্যায়সংগত?

সূরা আল-বাকারা: নাম ও অর্থ

কুরআনের দ্বিতীয় সূরার নাম আল-বাকারা।

  • বাকারা (بقرة) অর্থ: গাভী
  • ইংরেজি অনুবাদ: The Cow

এই সূরার শুরুতেই মানবজাতির তিনটি শ্রেণির কথা বলা হয়েছে—মুমিন, কাফির ও মুনাফিক। আলোচ্য ৬–৭ নম্বর আয়াত মূলত একটি বিশেষ শ্রেণির কাফিরদের প্রসঙ্গে অবতীর্ণ।

আলোচিত আয়াত (অপরিবর্তিত)

Arabic / English Translation:

“Verily, those who disbelieve, it is the same to them whether you warn them or do not warn them, they will not believe.

Allah has set a seal on their hearts and on their hearings, and on their eyes there is a covering. Theirs will be a great torment.”
— Surah Al-Baqara 2:6–7

বাংলা অনুবাদ:

“নিশ্চয় যারা অস্বীকার করে, তাদের আপনি সাবধান করুন আর না-ই করুন, তারা বিশ্বাস করবে না। আল্লাহ তাদের হৃদয়ে এবং তাদের কর্ণকুহরে মোহর মেরে দিয়েছেন; আর তাদের দৃষ্টির ওপর রয়েছে আবরণ। তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি।”

আপত্তির মূল বক্তব্য

আপত্তিকারীদের যুক্তি সাধারণত এমন:

  • মোহর মারা মানে তালাবদ্ধ করে দেওয়া।
  • যদি আল্লাহ কাফিরদের হৃদয় ও কানে মোহর মেরে দেন, তাহলে তারা সত্য উপলব্ধি করতে পারবে না।
  • যেহেতু তারা সত্য বুঝতে পারছে না, তাই কাফির থেকে যাচ্ছে বা নাস্তিক হচ্ছে।
  • আবার শেষ পর্যন্ত তাদের জন্য শাস্তির ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো—যেখানে আল্লাহ নিজেই সত্য বোঝার পথ বন্ধ করে দিচ্ছেন, সেখানে শাস্তি দেওয়াটা কি ন্যায়বিচার?

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: কারা এই কাফির?

ইসলামের ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, এক শ্রেণির লোক ছিল যারা ইচ্ছাকৃতভাবে সত্যকে অস্বীকার করত। তারা রাসূল ﷺ–এর কাছে নানা রকম শর্ত দিত, অলৌকিক নিদর্শন দাবি করত।

বর্ণনায় এসেছে—

তারা বলত:

“হে মুহাম্মদ, আমার হাতের মুঠোয় কী আছে বলে দিতে পারলে আমি ইসলাম গ্রহণ করব।”

রাসূল ﷺ উত্তরে বলতেন:

“তোমার হাতের জিনিসই বলুক, সেটি কী।”

আল্লাহর কুদরতে পাথর পর্যন্ত সত্যের সাক্ষ্য দিত। কিন্তু এত স্পষ্ট প্রমাণ দেখার পরও তারা বলত:

“এ তো জাদু! এ তো জ্যোতিষ!”

অর্থাৎ, তারা আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল—যে কোনো মূল্যে সত্য অস্বীকার করবেই।

এই আয়াতগুলো মূলত সেই শ্রেণির লোকদের প্রসঙ্গে, যাদের সামনে সত্য পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরও তারা অহংকার ও হঠকারিতাবশত তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

অন্তরে মোহর: কারণ না ফল?

এখানেই মূল ভুল বোঝাবুঝি। অনেকেই ধরে নেয়—

আল্লাহ আগে মোহর মারেন → তারপর মানুষ অবিশ্বাসী হয়।

কুরআনের বক্তব্য কিন্তু উল্টো:

মানুষ বারবার সত্য প্রত্যাখ্যান করে → তার ফল হিসেবে আল্লাহর নির্ধারিত নিয়মে অন্তরে মোহর পড়ে।

অর্থাৎ, মোহর হলো কারণ নয়, ফল।

না খাওয়ার সিদ্ধান্ত

একটি সহজ উদাহরণ

ধরুন, কেউ দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিল—

“আমি খাব না। যতই বলা হোক, আমি খাব না।”

এখন কী হবে?

  • দীর্ঘদিন না খেলে শরীর শুকিয়ে যাবে
  • রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে
  • একসময় কঠিন রোগ দেখা দেবে

এখানে প্রশ্ন করা যেতে পারে—

“শরীর শুকিয়ে যাওয়া কি আল্লাহ জোর করে করালেন?”

উত্তর হলো—না।

এটা একটি সিস্টেম। আল্লাহ এমন একটি নিয়ম তৈরি করেছেন—খাবার না খেলে শরীর দুর্বল হবে। আপনি নিজেই যখন খাব না বলে সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।

একই নিয়ম বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও

ঠিক তেমনিভাবে—

  • কেউ যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে: “আমি বিশ্বাস করব না”
  • সামনে যত প্রমাণ, দলিল, যুক্তিই আসুক—সে প্রত্যাখ্যান করবে

তখন কী ঘটে?

  • ধীরে ধীরে তার উপলব্ধিশক্তি নিস্তেজ হয়ে যায়
  • সত্য শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলে
  • দেখেও না দেখার ভান করে

কুরআনের ভাষায় এটিই হলো—

অন্তরে ও কানে মোহর পড়া, চোখে পর্দা পড়ে যাওয়া।

এটি কোনো জোরপূর্বক শাস্তি নয়; বরং মানুষের নিজের সিদ্ধান্তের স্বাভাবিক ও ন্যায়সঙ্গত পরিণতি।

তাহলে শাস্তি কেন?

যেহেতু:

  • সিদ্ধান্তটা মানুষের নিজের
  • অস্বীকারটা ইচ্ছাকৃত
  • সত্য স্পষ্ট হওয়ার পরও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে

তাই এর পরিণতি বা শাস্তি অন্যায় হয় না। ঠিক যেমন—

না খেয়ে নিজেকে অসুস্থ করলে, অসুখের দায় অন্যের উপর চাপানো যায় না।

আল্লাহ এখানে জুলুম করছেন না; বরং তিনি তাঁর নির্ধারিত ন্যায়সংগত সিস্টেম অনুযায়ী ফলাফল কার্যকর করছেন।

উপসংহার

সূরা আল-বাকারা ৬–৭ নম্বর আয়াত কোনোভাবেই মানব স্বাধীন ইচ্ছার বিরোধী নয়। বরং এটি মানুষের ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতার মনস্তাত্ত্বিক ও আধ্যাত্মিক পরিণতি ব্যাখ্যা করে।

  • আল্লাহ প্রথমে পথ দেখান
  • প্রমাণ দেন
  • সুযোগ দেন

কিন্তু কেউ যদি জেনেশুনে, অহংকারবশত সত্য প্রত্যাখ্যান করে—তাহলে সেই প্রত্যাখ্যানই একসময় তার অন্তরকে অন্ধ করে দেয়।

এক্ষেত্রে দায় আল্লাহর নয়; দায় মানুষের নিজের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© 2025 Logic TV — All Rights Reserved.